১ ফেব্রুয়ারি রবিবার শ্রীলঙ্কার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে আসন্ন গণভোট ও ভোটার উত্সাহের জন্য এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার প্রধান বক্তা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ, যিনি স্বৈরাচার বিরোধী সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে বিশদভাবে আলোকপাত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, জাতি ১৬ বছর ধরে স্বাধীনতার গৌরব গুনে আসছে এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান স্বৈরাচারী শাসনের থেকে সাময়িক মুক্তি এনে দিয়েছে।
রীয়াজের মতে, বর্তমান সংবিধানে স্বৈরাচার সৃষ্টির সম্ভাবনা এখনও রয়ে গেছে, তাই কোনো শাসনব্যবস্থা জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেয় তা নিশ্চিত করার জন্য জুলাই সনদ গৃহীত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সনদ স্বৈরাচারী প্রবণতা রোধে একটি কাঠামোগত বাধা হিসেবে কাজ করবে।
বক্তা ‘হ্যাঁ’ শব্দের প্রার্থীর প্রশ্নের উত্তরে উল্লেখ করেন, ‘হ্যাঁ’ এর প্রার্থী কোনো একক ব্যক্তি নয়, বরং প্রত্যেক নাগরিক, নিজে, আমি, আমরা সবাই। তিনি যুক্তি দেন, এই সম্মিলিত ভোটের মাধ্যমে একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল আসন্ন গণভোটের প্রস্তুতি এবং ভোটারদের অংশগ্রহণের প্রতি উৎসাহ বৃদ্ধি করা। রীয়াজের বক্তব্যের সময় তিনি স্বৈরশাসন ও দুঃশাসনের কোনো রূপ আর স্বীকার না করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি ভবিষ্যতে সমতা, সমান অধিকার এবং আনন্দময় সমাজের স্বপ্ন বর্ণনা করেন, যেখানে কোনো বাহিনীর হুমকি বা গায়েবি মামলার ভয় থাকবে না।
রীয়াজ জোর দিয়ে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই উত্থান দেশের রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করেছে এবং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠায় সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ইতিমধ্যে কিছু সংস্কার বাস্তবায়িত হয়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, বর্তমান সংস্কারগুলো যথেষ্ট নয়; আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের প্রয়োজন। এজন্য দেশের সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা সংবিধানিক কাঠামোকে শক্তিশালী করবে।
জুলাই সনদের মূল বিধানগুলোর মধ্যে রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ গঠন, যাতে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করে সংবিধানিক পরিবর্তন পরিচালনা করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ সংবিধানিক সংশোধনের জন্য জনগণের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা হবে, ফলে ক্ষমতাসীনরা একতরফা পরিবর্তন করতে পারবে না।
বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের মধ্যে থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হবে, যা পার্টি সমন্বয়কে নিশ্চিত করবে। এছাড়া, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দশ বছর পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন, যা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধ করবে।
বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে, ফলে বিচারিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি কমে যাবে। রীয়াজের মতে, এই ব্যবস্থা দেশের আইনি কাঠামোকে স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং স্বৈরাচারী প্রবণতা দমন হবে। তবে তারা সতর্ক করেছেন, সনদের কার্যকরী বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
আসন্ন গণভোটের প্রস্তুতি চলাকালীন, রীয়াজের বক্তব্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সকল দলকে এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে, যাতে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো দৃঢ় হয়।
সভার শেষে অংশগ্রহণকারীরা রীয়াজের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো নিয়ে আলোচনা করেন এবং বাস্তবায়নের পথনির্দেশনা চিহ্নিত করেন। তিনি ভবিষ্যতে এই সনদের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব পুনরায় জোর দেন।
সামগ্রিকভাবে, জুলাই সনদ স্বৈরাচার বিরোধী একটি কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে তৈরি, যা সংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য জনগণের সম্মতি, সরকার-বিরোধী সমন্বয় এবং বিচারিক স্বায়ত্তশাসনকে মূল স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করে। রীয়াজের বক্তব্যের ভিত্তিতে, আগামী দিনগুলোতে এই সনদের কার্যকরী প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কারগুলো দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুন দিকনির্দেশনা দেবে।



