ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারড্যাম (IFFR) এর ৫৫তম সংস্করণে শনি রাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। ফরাসি পরিচালক ফ্রাঁসোয়া ওজন আলবের ক্যামুসের উপন্যাস ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ (L’étranger) এর একই নামের সিনেমা উপস্থাপন করেন, আর আলজেরিয়ার ডকুমেন্টারি নির্মাতা মালেক বেনস্মাইল তার প্রথম ফিকশন ফিচার ‘দ্য আরব’ বড় স্ক্রিন প্রতিযোগিতায় উপস্থাপন করেন।
‘দ্য আরব’ চলচ্চিত্রটি ক্যামুসের মূল কাহিনীর একটি অজানা চরিত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। উপন্যাসে ‘দ্য আরব’ নামে উল্লেখিত শিকারের নাম চলচ্চিত্রে মোসা রাখা হয়েছে, এবং তার গল্প তার বয়স্ক ভাই হারুনের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই পদ্ধতি স্মৃতি, পরিচয় এবং ঔপনিবেশিক অতীতের পুনর্মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, যেখানে আলজেরিয়া ১৯৬২ পর্যন্ত ১৩২ বছর ফরাসি উপনিবেশ ছিল।
ফিল্মটি আলজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ, যা দেশীয়ভাবে ‘ব্ল্যাক ডেসেড’ বা ‘ডার্টি ওয়ার’ নামে পরিচিত, তার দিকেও ইঙ্গিত দেয়। ১৯৯২ থেকে ২০০২ পর্যন্ত সরকার ও ইসলামিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘটিত এই সংঘাতের প্রভাব চলচ্চিত্রের বর্ণনায় সূক্ষ্মভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ‘দ্য আরব’ মূলত ২০১৩ সালে আলজেরিয়ান লেখক কামেল দাউদের ‘দ্য মিউরসো ইনভেস্টিগেশন’ উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে ক্যামুসের মূল নায়ক মিউরসোকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে পুনরায় দেখা হয়েছে।
চলচ্চিত্রে হারুনের বর্ণনা শিকারের মৃত্যুর পর তার নিজের জীবন ও পরিবারের উপর কীভাবে প্রভাব ফেলেছে তা উন্মোচন করে। গল্পটি একটি রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের রূপ নেয়, যেখানে স্পষ্ট উত্তর বা সহজ সমাধান পাওয়া যায় না। এই অনিশ্চয়তা দর্শকদেরকে অতীতের জটিলতা ও মানবিক দায়িত্বের প্রশ্নে উদ্বুদ্ধ করে।
‘দ্য আরব’ এর প্রধান চরিত্রের মা ভূমিকায় পালিত হয়েছে ফিলিস্তিনি অভিনেত্রী হিয়াম আব্বাস, যিনি ‘সাক্সেশন’ সিরিজে মার্সিয়া রয়ের চরিত্রের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তার উপস্থিতি চলচ্চিত্রে অতিরিক্ত আবেগগত গভীরতা যোগ করে, বিশেষ করে মা ও সন্তানদের সম্পর্কের সূক্ষ্ম দিকগুলোকে তুলে ধরে।
মালেক বেনস্মাইলের পূর্ববর্তী কাজগুলোর মধ্যে ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালান্সেস’, ‘এলিয়েনেশনস’ এবং ‘দ্য ব্যাটল অফ আলজিয়ার্স, এ ফিল্ম উইথিন হিস্টরি’ অন্তর্ভুক্ত, যা তার ডকুমেন্টারি শৈলীর সমৃদ্ধি ও সামাজিক বিষয়ের প্রতি সংবেদনশীলতা প্রকাশ করে। ‘দ্য আরব’ এ তিনি প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ ফিকশন ফরম্যাটে কাজ করছেন, যদিও গল্পের কাঠামো ও বর্ণনা পদ্ধতি তার ডকুমেন্টারি অভিজ্ঞতার ছাপ বহন করে।
চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য মালেক বেনস্মাইল এবং জ্যাক ফিসেচি একসাথে রচনা করেছেন। দুজনের সহযোগিতা ক্যামুসের মূল রচনার সঙ্গে নতুন দৃষ্টিকোণ যুক্ত করে, যা আলজেরিয়ার ইতিহাস ও আধুনিক সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলে। ফিসেচি পূর্বে ফরাসি চলচ্চিত্রে তার সূক্ষ্ম সংলাপ ও চরিত্র গঠনের জন্য পরিচিত, যা ‘দ্য আরব’ এও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
IFFR-এ ‘দ্য আরব’ এর প্রিমিয়ার দর্শকদের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। চলচ্চিত্রের স্মৃতি ও পরিচয়ের অনুসন্ধান, ঔপনিবেশিক অতীতের পুনর্মূল্যায়ন এবং গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটের সংমিশ্রণকে সমালোচকরা প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে, হিয়াম আব্বাসের পারফরম্যান্সকে শক্তিশালী ও আবেগপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা গল্পের মানবিক দিককে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।
‘দ্য আরব’ এবং ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ উভয়ই ক্যামুসের মূল কাজের আধুনিক পুনর্নির্মাণের অংশ, তবে তাদের পদ্ধতি ও ফোকাসে পার্থক্য রয়েছে। ওজনের চলচ্চিত্র মূল উপন্যাসের সরাসরি রূপান্তর, যেখানে বেনস্মাইলের কাজ অতীতের একটি অনাবিষ্কৃত চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন বর্ণনা গড়ে তোলার চেষ্টা করে। এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি দর্শকদেরকে ক্যামুসের থিমের বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা প্রদান করে।
রটারড্যাম ফেস্টিভ্যালে ‘দ্য আরব’ এর অংশগ্রহণ আলজেরিয়ান চলচ্চিত্র শিল্পের আন্তর্জাতিক মঞ্চে দৃশ্যমানতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। চলচ্চিত্রটি ঐতিহাসিক স্মৃতি, সামাজিক সংঘাত এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের জটিলতা নিয়ে আলোচনা করে, যা আজকের বিশ্বে প্রাসঙ্গিক বিষয়।
ফেস্টিভ্যালের শেষের দিকে, ‘দ্য আরব’ এর সাফল্য ও প্রভাবের ওপর আলোচনা চলবে, যেখানে চলচ্চিত্র নির্মাতা, সমালোচক এবং দর্শকরা একত্রে কাজের দিকনির্দেশনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময় করবেন। এই আলোচনার মাধ্যমে আলজেরিয়ান সিনেমার নতুন দিক উন্মোচিত হবে এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতে তার অবস্থান আরও দৃঢ় হবে।



