কিউবার নাগরিকরা, বিশেষ করে হাভানা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায়, মার্কিন সরকারের “গলা চেপে ধরার” হুমকি এবং দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুৎ ঘাটতি, জ্বালানি ও খাবারের দাম বৃদ্ধির মুখোমুখি হয়ে বেঁচে থাকার কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে। এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের চাপ এবং সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলা ও মেক্সিকোর তেল সরবরাহ বন্ধের উল্লেখ করা হয়েছে। তিন সপ্তাহের মধ্যে কিউবান পেসো মার্কিন ডলারের তুলনায় প্রায় দশ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যে তীব্র বৃদ্ধি ঘটিয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে হাভানা ও তার আশেপাশের এলাকায় ত্রিশের বেশি বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে; এদের মধ্যে রাস্তায় বিক্রেতা, বেসরকারি খাতের কর্মী, ট্যাক্সি চালক এবং সরকারি কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত। সবাই একমত যে, মার্কিন সরকারের আর্থিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা দেশের অর্থনীতিকে চরম সীমায় নিয়ে এসেছে এবং মৌলিক সেবার অভাব বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাজারে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি বিশেষভাবে তীব্র, ফলে গ্যাসোলিন ও ডিজেল দামের উত্থান ঘটেছে এবং গণপরিবহন, গাড়ি চালনা ও কৃষি কাজের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে, খাদ্যদ্রব্য, গৃহস্থালির জিনিসপত্র এবং চিকিৎসা সামগ্রীর দামও পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে কিউবার গ্রামীণ এলাকায় পুরনো ও ভঙ্গুর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রয়েছে; ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, ইন্টারনেট ও পানির পাম্পের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া সাধারণ ঘটনা। এই অবস্থা গ্রামবাসীদেরকে বিদ্যুৎ ও মৌলিক সেবার অনিয়মিত সরবরাহের সঙ্গে অভ্যস্ত করে তুলেছে, যদিও শহরের তুলনায় কিছুটা কম প্রভাবিত হয়।
হাভানা শহর, যেখানে ১৯৫০-এর দশকের ক্লাসিক গাড়ি এবং রঙিন ঔপনিবেশিক স্থাপত্য দেখা যায়, আগে কিছুটা স্বস্তি পেত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি ঘাটতি বাড়ার ফলে শহরের রাস্তায় গাড়ি চলাচল ও বাস সেবায় বাধা সৃষ্টি হয়েছে, এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সংখ্যা বেড়েছে।
ভেনেজুয়েলা এবং পরে মেক্সিকো থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় জ্বালানি সংকট তীব্রতর হয়েছে; এই দুই দেশের তেল কিউবার শক্তি উৎপাদনের প্রধান উৎস ছিল। তেল সরবরাহের অভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি পায় না, ফলে বিদ্যুৎ ঘাটতি বাড়ে এবং দামের চাপ বাড়ে।
কিউবার দীর্ঘমেয়াদী মিত্র ভেনেজুয়েলারা, মাদুরোর শাসনকালে, কিউবাকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করেছিল; এই সমর্থন বজায় রাখতে কিউবান সেনাবাহিনীকে কয়েক ডজন সৈনিকের প্রাণ দিতে হয়েছে। তেল সরবরাহের বন্ধের ফলে এই মিত্রতা দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা দেশের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা অবস্থানে প্রভাব ফেলছে।
অনেক দেশের মতো, কিউবায়ও অর্থনৈতিক সংকটের সময় রাস্তায় প্রতিবাদ দেখা যায়, তবে এখন পর্যন্ত কোনো বৃহৎ প্রতিবাদ গোষ্ঠী গঠিত হয়নি। যদিও জনগণের ধৈর্য হ্রাস পাচ্ছে, তবু সরকার কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে জনসমাবেশকে সীমাবদ্ধ রাখছে।
মুদ্রা অবমূল্যায়নের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে; পেসোর ডলারের তুলনায় হ্রাসের ফলে আমদানি করা পণ্যগুলোর মূল্য দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই আর্থিক চাপের ফলে গৃহস্থালির বাজেট সংকুচিত হয়েছে এবং বেকারত্বের হার বাড়ছে।
হাভানার এক গৃহিণী বলেন, “এটি আমাকে এমন এক অবস্থায় ফেলেছে যেখানে কোনো বেতনই এই পরিস্থিতি সামলাতে পারে না।” তার কথা দেশের বৃহত্তর অংশের মানুষের অনুভূতিকে প্রতিফলিত করে, যারা মৌলিক চাহিদা পূরণে সংগ্রাম করছেন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, যদি মার্কিন সরকারের আর্থিক চাপ অব্যাহত থাকে এবং তেল সরবরাহের বিকল্প না পাওয়া যায়, তবে কিউবার অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়তে পারে, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির প্রতি অবহেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিউবার সরকারকে নতুন কূটনৈতিক পথ অনুসন্ধান করতে হতে পারে, অথবা অভ্যন্তরীণ নীতি সমন্বয় করে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।



