সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে পাকিস্তান ও ইরান থেকে ৫ মিলিয়নেরও বেশি আফগান তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দশ শতাংশের সমান। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) অনুযায়ী, গত বছর একা তিন মিলিয়ন মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেছে; তাদের মধ্যে কিছু দশকেরও বেশি সময় বিদেশে বসবাস করেও এখন ফিরে এসেছে।
ফেরতপ্রাপ্তদের অধিকাংশই পরিবারসহ অথবা একা সীমান্তে পৌঁছায়, তবে তাদের নতুন জীবনের সূচনা কঠিন শর্তে হচ্ছে। দেশে বিদ্যমান দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা তাদের জন্য অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি করছে। IOM-এর আফগান শাখার সহ-প্রধান মুত্যা ইজোরা মাসকুন উল্লেখ করেছেন, এত বড় পরিমাণের মানুষকে সামলানো যে কোনো দেশের জন্য চ্যালেঞ্জপূর্ণ।
একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ফিরে আসার কয়েক মাসের মধ্যে ৮০ শতাংশ ফেরতপ্রাপ্তের স্থায়ী বাসস্থান নেই এবং তারা পাথর, মাটি ইত্যাদি সাময়িক উপকরণ দিয়ে তৈরি শেল্টারে বসবাস করতে বাধ্য। এই শর্তে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মৌলিক সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ইউএন শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত ফিরে আসা ১,৬৫৮ জনের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশই ভাড়া পরিশোধে অক্ষম। অধিকাংশ পরিবার চারজন পর্যন্ত একসাথে একটি ঘরে বসবাস করে, যা গৃহস্থালীর স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
কর্মসংস্থান পরিস্থিতি ততটা উজ্জ্বল নয়। IOM-এর তথ্য অনুসারে, ফেরতপ্রাপ্তদের মধ্যে মাত্র ১১ শতাংশই পূর্ণকালীন কাজ পেয়েছে। প্রথম কয়েক মাসে গড়ে মাসিক আয় মাত্র ২২ থেকে ১৪৭ ডলার, যা দেশের গড় মজুরির তুলনায় খুবই কম। এই আর্থিক সীমাবদ্ধতা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বিদ্যুৎ সরবরাহের অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। সমীক্ষা অনুযায়ী, অর্ধেকের বেশি গৃহস্থালী স্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে ভুগছে। বিশেষ করে নারীর নেতৃত্বে থাকা পরিবারগুলোকে বেশি ঝুঁকি ও দুর্বলতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে; প্রায় অর্ধেক পরিবারই মৌলিক সেবা, যেমন পানীয় জল ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশে সমস্যার সম্মুখীন।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, পাকিস্তান ও ইরানের সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতি পরিবর্তন, যার মধ্যে বাড়তি ডিপোর্টেশন ও রিটার্ন প্রোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত, এই বৃহৎ ফেরতপ্রবাহের প্রধান কারণ। দু’দেশের সরকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে শরণার্থীদের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে আফগানদের পুনরায় দেশে ফিরে আসতে বাধ্য করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে আফগান শরণার্থীদের জন্য মানবিক সহায়তা প্রদান করে আসছে, তবে এখন তারা পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন প্রকল্পে ত্বরান্বিত সহায়তা বাড়াতে হবে। একটি আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “আফগানিস্তানের বর্তমান মানবিক সংকট সমাধানের জন্য বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ও আর্থিক সহায়তা অপরিহার্য, নইলে দেশটি দারিদ্র্য ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের চক্রে আটকে যাবে।”
অবস্থা উন্নত করার জন্য আফগান সরকারও পদক্ষেপ নিচ্ছে; তবে সীমিত সম্পদ ও অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য আন্তর্জাতিক তহবিলের প্রয়োজন। বর্তমানে, শরণার্থী পুনর্বাসন, গৃহ নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ত্বরান্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, ফিরে আসা মিলিয়ন সংখ্যক আফগানদের জন্য নিরাপদ ও টেকসই জীবন গড়ে তোলা একটি জটিল কাজ, যা মানবিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মাত্রায় সমন্বিত প্রচেষ্টা দাবি করে। আন্তর্জাতিক সংস্থা, দাতা দেশ এবং আফগান সরকারকে একসঙ্গে কাজ করে এই মানবিক সংকটের সমাধান খুঁজে বের করতে হবে, যাতে শরণার্থীরা পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে।



