টোকিওতে জাপান সরকারের অনুমোদনে আফগানিস্তান দূতাবাসের সব কাজ আজ শেষ করা হয়েছে, যা শনিবারের শেষ কার্যদিবসের পর থেকে কার্যকর। দূতাবাসের প্রধান শিদা মোহাম্মদ আবদালি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, “ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি টোকিও ছাড়ছি” এবং একই সঙ্গে নিশ্চিত করেছেন যে দূতাবাসের সব সেবা অবিলম্বে স্থগিত। এই সিদ্ধান্তের পেছনে জাপান সরকারের দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক নীতি এবং তালেবান শাসনের স্বীকৃতি না দেওয়া মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবদালি তার পোস্টে উল্লেখ করেন, তিনি আজ টোকিও ত্যাগ করছেন এবং দূতাবাসের কার্যক্রম বন্ধের পর আর কোনো কনস্যুলার সেবা প্রদান করা হবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই পদক্ষেপের ফলে আফগান নাগরিকদের জন্য পাসপোর্ট, ভিসা ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা এখন আর টোকিওতে পাওয়া যাবে না। দূতাবাসের বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে জাপান সরকার সব ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থগিত করেছে, যা দেশের কূটনৈতিক নেটওয়ার্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করে।
দূতাবাস বন্ধ হওয়ার আগে এটি আফগানিস্তান ও জাপানের মধ্যে সরকারি যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করত, পাশাপাশি জাপানে বসবাসরত আফগানদের জন্য পাসপোর্ট নবায়ন, ভিসা ইস্যু এবং অন্যান্য কনস্যুলার সেবা প্রদান করত। এই সেবাগুলো বিশেষত শিক্ষার্থী, কর্মী এবং শরণার্থী সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ তারা প্রায়ই ভ্রমণ ও কাজের অনুমোদনের জন্য দূতাবাসের ওপর নির্ভর করত। দূতাবাসের বন্ধের ফলে এই গোষ্ঠীর জন্য এখন নতুন কনস্যুলার চ্যানেল খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখল করার পর থেকে বিশ্বজুড়ে আফগান দূতাবাসগুলোর কার্যক্রম একের পর এক বন্ধ বা সীমিত হয়ে এসেছে। বহু দেশের সরকার পূর্বের আফগান সরকার দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত কূটনীতিকদের পদত্যাগ বা বরখাস্তের আদেশ দিয়েছে, ফলে মিশনের পরিচালনায় বড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিবেশে আফগান প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি বাড়িয়ে তুলেছে এবং বিদেশে বসবাসরত আফগান নাগরিকদের জন্য কূটনৈতিক সুরক্ষা হ্রাস করেছে।
জাপান সরকার এখনও তালেবান নেতৃত্বাধীন আফগান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি, ফলে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত এবং মূলত মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। জাপান সরকার পূর্বে আফগান শরণার্থীদের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং মৌলিক মানবিক সেবা প্রদান করেছে, তবে এই সহায়তা এখনো দূতাবাসের মাধ্যমে সমন্বিত হয় না। তাই দূতাবাসের বন্ধের পর জাপান সরকারকে নতুন মানবিক চ্যানেল গড়ে তুলতে হবে, যাতে সহায়তা প্রয়োজনীয়দের কাছে পৌঁছানো যায়।
দূতাবাসের বন্ধের ফলে টোকিওতে বসবাসরত প্রায় দুইশো আফগান নাগরিকের কনস্যুলার সেবা বন্ধ হয়ে গেছে, যা তাদের পাসপোর্ট নবায়ন, ভিসা আবেদন এবং জরুরি সাহায্য পাওয়া কঠিন করে তুলেছে। এই গোষ্ঠী এখন জাপানের অন্যান্য কূটনৈতিক মিশন, যেমন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা থেকে সহায়তা নিতে বাধ্য। তবে এই বিকল্পগুলো সবসময় সহজলভ্য নয়, কারণ ভিসা ও পাসপোর্টের প্রক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে এবং সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
বিশ্বব্যাপী আফগান কূটনৈতিক মিশনের সংখ্যা ২০২১ সালের পর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে; ডজনের বেশি মিশন বন্ধ বা কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে। এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নেটওয়ার্কে আফগান সরকারের প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি বাড়িয়ে তুলেছে এবং শরণার্থী ও অভিবাসী সমস্যার সমাধানে জটিলতা সৃষ্টি করেছে। বিশেষত ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ এখনও সীমিত কনস্যুলার সেবা প্রদান করে, তবে তাদের পরিসরও সংকুচিত হয়েছে।
জাপান সরকারের এই পদক্ষেপের পর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা অনুমান করছেন যে জাপান ভবিষ্যতে মানবিক সহায়তার জন্য অন্য কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করতে পারে, যেমন জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) বা আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা। একই সঙ্গে, জাপান সরকার আফগান শরণার্থীদের জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যদিও কূটনৈতিক কাঠামো এখনো অনিশ্চিত। এই নীতি পরিবর্তনগুলো জাপানের দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে মানবিক দায়িত্বকে রাজনৈতিক স্বীকৃতির ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
দূতাবাসের বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে জাপান সরকার আফগান নাগরিকদের জন্য বিকল্প কনস্যুলার সেবা গড়ে তোলার জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সূচনা করতে পারে, তবে তা তালেবান সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করতে পারে। বর্তমানে জাপান সরকার তালেবানকে কোনো সরকারি স্বীকৃতি না দিয়ে কূটনৈতিক চ্যানেল বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নীতিতে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে। ভবিষ্যতে এই ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকবে, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতি এবং মানবিক সহায়তার চাহিদার ওপর নির্ভর করবে।
সংক্ষেপে, জাপানে আফগান দূতাবাসের বন্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরিবর্তন, যা আফগান নাগরিকদের কনস্যুলার সেবা ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। জাপান সরকার মানবিক সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে, তবে তালেবান শাসনের স্বীকৃতি না দিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্কের সীমা নির্ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিবেশে আফগান প্রতিনিধিত্বের সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে এবং ভবিষ্যতে নতুন কূটনৈতিক মডেলের প্রয়োজনীয়তা বাড়াবে।



