মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার স্থানীয় সময়ে জানিয়েছেন যে ভারত ইরানের পরিবর্তে ভেনেজুয়েলা সরকারের তেল ক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন করেছে। তিনি উল্লেখ করেন যে এই চুক্তি ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে এবং ভারতীয় গ্যাসোলিন ও ডিজেল শিল্পের জন্য নতুন সরবরাহের পথ খুলে দেবে। এই ঘোষণার পরও ভারতের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি।
ট্রাম্পের বক্তব্যে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, “আমরা ইতোমধ্যে এই চুক্তি সম্পন্ন করেছি।” তবে এনডিটিভি সূত্রে জানানো হয়েছে যে, ভারতের সরকার থেকে এই বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি। এই অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রশ্ন তুলেছে যে, ভারতীয় তেল আমদানি নীতিতে সত্যিই কোন পরিবর্তন ঘটবে কিনা।
পটভূমিতে উল্লেখযোগ্য যে, ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলা সরকারের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের অপারেশনে আটক করা হয়। ট্রাম্পের মতে, এই ঘটনার পর থেকে মার্কিন সরকার ভেনেজুয়েলা তেলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে এবং তা আন্তর্জাতিক বাজারে পুনর্বিন্যাসের সূচনা করেছে।
ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, লুজিয়ানা ও মিসিসিপি রাজ্যের রিফাইনারিগুলিতে মোট ১৮টি ট্যাংকার লোড করে পাঠানো হয়। এই শিপমেন্টগুলো ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বশেষ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বর্তমানে ভেনেজুয়েলা সরকারের তেল প্রায় প্রতিদিন ২ লাখ ৭৫ হাজার ব্যারেল পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাচ্ছে, যা গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি।
অপহরণের পূর্বে ভেনেজুয়েলা সরকার চীনে দৈনিক প্রায় চার লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করত। তবে জানুয়ারি মাসে এই রপ্তানি শূন্যে নেমে আসে, যা ভেনেজুয়েলা তেলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটে বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে। এই পরিবর্তন ভারতের তেল আমদানি কৌশলে নতুন সুযোগের ইঙ্গিত দেয়, তবে একই সঙ্গে সরবরাহের অনিশ্চয়তাও বাড়ায়।
গত শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভেনেজুয়েলা সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। মাদুরোর অপহরণের পর রদ্রিগেজের সঙ্গে মোদির প্রথম ফোনালাপের সময় দুই দেশের সম্পর্ককে “নতুন উচ্চতায়” নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করা হয়। এই সংলাপটি ভেনেজুয়েলা তেল ক্রয়ের সম্ভাব্য চুক্তির জন্য রাজনৈতিক সমর্থন তৈরি করতে পারে।
ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ভারত যদি ভেনেজুয়েলা তেল ক্রয় করে তবে তার তেল আমদানি পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য আসবে এবং ইরানের ওপর নির্ভরতা কমবে, যা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে রক্ষা পেতে সহায়ক হতে পারে। তবে ভেনেজুয়েলা তেলের সরবরাহ এখন মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায়, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তন বা নতুন নিষেধাজ্ঞা ভারতীয় শিপার ও রিফাইনারিগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের তেল চাহিদা বৃদ্ধি গ্লোবাল ক্রুড মূল্যে ঊর্ধ্বগতি ঘটাতে পারে, যা এশিয়ার তেল বাজারে প্রভাব ফেলবে।
ঝুঁকি দিক থেকে, মার্কিন সরকার ভেনেজুয়েলা তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখলে তেল রপ্তানি লাইসেন্স, শিপিং রুট ও পেমেন্ট সিস্টেমে কঠোর শর্ত আরোপ করতে পারে। এমন শর্তে ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে আন্তর্জাতিক আর্থিক সিস্টেমে বাধা ও সম্ভাব্য দণ্ডের মুখোমুখি হতে হতে পারে। তাছাড়া, ভেনেজুয়েলা তেলের উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামো রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অস্থির হতে পারে, যা সরবরাহের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, যদি ভারত-ভেনেজুয়েলা তেল চুক্তি বাস্তবায়িত হয়, তবে ভারতীয় রিফাইনারিগুলো কম দামের তেল পেতে পারে, তবে তা অর্জনের জন্য মার্কিন সরকারের সঙ্গে সমন্বয় ও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে। বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে, মার্কিন-ভেনেজুয়েলা সম্পর্কের কোনো উত্তেজনা বাড়লে এশিয়ার তেল বাজারে সরবরাহের অস্থিরতা বাড়বে এবং দাম উত্থান পেতে পারে। তাই, ভারতীয় তেল আমদানিকারকদের জন্য এই চুক্তি কৌশলগত সুবিধা ও জটিল ঝুঁকির সমন্বয় ঘটাবে।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের ঘোষণায় ভারত ভেনেজুয়েলা তেল ক্রয়ের সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন রূপ দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা তেল নিয়ন্ত্রণ, ভারতীয় শিপারদের কৌশলগত পরিকল্পনা এবং ভেনেজুয়েলা সরকারের রপ্তানি নীতি একসাথে গঠিত হবে ভবিষ্যৎ তেল সরবরাহের দিকনির্দেশনা। এই পরিবর্তনগুলো গ্লোবাল তেল বাজারে মূল্য, সরবরাহ নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির ওপর প্রভাব ফেলবে।



