দক্ষিণের শেষ প্রান্তে অবস্থিত পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া‑রাঙ্গাবালি) আসনের চরবসতিগুলোতে জাতীয় নির্বাচনের আগমনে ভোটারদের মনোভাব স্পষ্ট হয়েছে। গঙ্গামতীর চর, কাউয়ার চর ও লেবুর চর—যেখানে আর কোনো গ্রাম বা প্রশাসনিক সীমানা নেই, শুধুই সমুদ্রের ঢেউ—এখানে বসবাসকারী মানুষগুলো জোয়ার‑ভাটার সঙ্গে লড়াই করে জীবিকা নির্বাহের পরেও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে চিন্তিত।
এই তিনটি চরবসতি দেশের সবচেয়ে দূরবর্তী জনবসতি, যেখানে মৌসুমী বন্যা, পানির ঘাটতি ও মৌলিক সেবার অভাব দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ। তবুও ভোটের পরিণতি, ক্ষমতায় কে আসবে এবং তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসবে কিনা—এই প্রশ্নগুলো এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
স্থানীয় প্রশাসন ভোটের পর এই বাসিন্দাদের অবহেলাকে নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয় না, তাই ভোটের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলছে। গৃহহীনতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার অভাবের মুখোমুখি হয়ে তারা ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তনের আশা রাখে।
বৈধ ভোটারদের সঙ্গে করা ২৩ জনের সাক্ষাৎকারে দেখা যায়, ভোটের প্রতি তাদের আগ্রহ তীব্র, যদিও ভোটের পর ফলাফল নিয়ে সন্দেহও রয়েছে। একজন শুঁটকিপল্লি বাসিন্দা বললেন, “ভাই, কতা কইলে বিপদ। আপনার লগে যে কতা কমু, পরে ক্ষতি অইলে মোগো অইবে। মোরা সাধারণ মানুষ।” এই বক্তব্যে ভোটের পর প্রভাবের অনিশ্চয়তা প্রকাশ পেয়েছে।
পটুয়াখালী-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী এ বি এম মোশাররফ হোসেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এবং একসময় আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকায় বড় নেতা হিসেবে স্বীকৃত।
জামায়াত-এ-ইসলামি নেতৃত্বাধীন ১১‑দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হলেন খেলাফত মজলিসের জহির উদ্দিন আহমেদ (দেয়ালঘড়ি)। তিনি ২০১৯ সালে রাঙ্গাবালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় সংগঠনের সমর্থন পেয়েছেন।
ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে তালিকায় রয়েছে কলাপাড়া উপজেলার পূর্বের বিএনপি সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে পটুয়াখালী-৪ আসন থেকে স্বল্প সময়ের জন্য সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং দুবার উপজেলা চেয়ারম্যান পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন।
এই তিনজন প্রার্থীর মধ্যে ভোটাররা প্রধানত তাদের পূর্বের সেবা, স্থানীয় সংযোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনা করে পছন্দ করছেন। চরবসতিতে বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক ও সেতু নির্মাণ, পানির সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রতিটি প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণায় চরবসতিতে সরাসরি গিয়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে প্রচারণার সময়সূচি ও প্রচার সামগ্রী সীমিত হওয়ায় তথ্যের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। তবুও ভোটাররা জানিয়েছেন, তারা ভোটের মাধ্যমে নিজেদের সমস্যার সমাধান আশা করছেন।
নির্বাচনের ফলাফল যদি চরবসতিতে উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের দিকে নিয়ে যায়, তবে জোয়ার‑ভাটার সঙ্গে লড়াই করা এই জনগোষ্ঠীর জীবনের মান উন্নত হতে পারে। অন্যদিকে, যদি ফলাফল প্রত্যাশা পূরণ না করে, তবে ভোটের পর অবহেলা অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও পুলিশ এই এলাকায় নিরাপদ ভোটদান নিশ্চিত করতে পর্যবেক্ষণ দল গঠন করেছে, যদিও পূর্বে কোনো উল্লেখযোগ্য অশান্তি ঘটেনি। ভোটের দিন নাগাদ ভোটার তালিকা, ভোটকেন্দ্রের অবস্থান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করা হবে।
সারসংক্ষেপে, পটুয়াখালী-৪ এর চরবসতিতে ভোটের প্রস্তুতি তীব্র, যদিও বাসিন্দাদের জীবনের মৌলিক চাহিদা এখনও পূরণ হয়নি। নির্বাচনের ফলাফল কীভাবে এই দূরবর্তী জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তব পরিবর্তন নিয়ে আসবে, তা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।



