বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের দাম ধারাবাহিকভাবে উঁচুতে পৌঁছেছে, এবং এর অস্থিরতা তিনটি মূল কারণের সঙ্গে যুক্ত, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নীতি প্রধান ভূমিকা পালন করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম এক সপ্তাহের মধ্যে প্রথমবারের মতো আউন্সে ৫,০০০ ডলার অতিক্রম করে, এবং স্বল্প সময়ে ৫,৫০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। একই সময়ে রুপা ও প্লাটিনামের দামও বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ঐতিহাসিক শীর্ষে পৌঁছে ২,৮৬,০০০ টাকায়। তবে পরের দুই দিনে দাম দুই দফায় প্রায় ৩০,০০০ টাকায় কমে যায়, যা স্থানীয় বাজারে তীব্র ওঠানামা নির্দেশ করে। এই পরিবর্তনগুলো আন্তর্জাতিক মূল্যের ওঠানামার সরাসরি প্রতিফলন।
একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমটি হল ট্রাম্পের বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। দ্বিতীয়টি হল ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, যার মধ্যে ইউক্রেনের যুদ্ধ, গাজা সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা অন্তর্ভুক্ত। তৃতীয়টি হল কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয়, যা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণকে শক্তিশালী করছে।
গ্লোবাল অনিশ্চয়তার সময় স্বর্ণ স্বাভাবিকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়ায়। বাণিজ্যিক টানাপোড়েন, ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে নিরাপদ সম্পদে রূপান্তরিত করে। এই প্রবণতা স্বর্ণের চাহিদা বাড়িয়ে দামের ঊর্ধ্বগতি ত্বরান্বিত করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয়ও দামের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বেশ কয়েকটি দেশ ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ বাড়াচ্ছে। রাশিয়ার ডলারভিত্তিক সম্পদ জব্দের ঘটনা অন্যান্য দেশকে সতর্ক করেছে, ফলে স্বর্ণকে তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতি ইউরোপ, চীন এবং কানাডার সঙ্গে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা বাড়িয়েছে। এই টানাপোড়েন বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদে পুঁজি স্থানান্তরকে ত্বরান্বিত করেছে।
ইউক্রেনের যুদ্ধ, গাজা সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা বিশ্ব রাজনীতিতে অতিরিক্ত ঝুঁকি যোগ করেছে। এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতগুলো আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে ঝুঁকি প্রিমিয়াম বাড়িয়ে স্বর্ণের চাহিদা বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে স্বর্ণের দাম শীর্ষে টিকে থাকতে পারে, তবে অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য মূল ঝুঁকি হল বাণিজ্যিক নীতি পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের তীব্রতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ নীতি। এই উপাদানগুলো একসাথে স্বর্ণের বাজারকে অস্থির রাখবে, যদিও নিরাপদ সম্পদ হিসেবে এর আকর্ষণ বজায় থাকবে।
সারসংক্ষেপে, স্বর্ণের দাম শীর্ষে পৌঁছেছে এবং ট্রাম্পের নীতি, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রয় এই অস্থিরতার মূল চালিকাশক্তি। বাজারের অংশগ্রহণকারীদের জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভবিষ্যতে দামের ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে।



