দোহার উপজেলার নুরুল্লাহপুরে চার শতাব্দীরও বেশি পুরনো গ্রামীণ মেলা নিরাপত্তা উদ্বেগের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের অনুমোদন না পেয়ে বাতিল করা হয়েছে। মেলায় অংশগ্রহণের জন্য দূর‑দূরান্তের বিক্রেতারা পণ্য নিয়ে মাঠে পৌঁছলেও, অনুমতি না থাকায় স্টল গঠন করতে পারছেন না এবং তাদের মালামালই মাঠে জমে আছে।
অনুমোদন না পেলে বিক্রেতারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। করিমগঞ্জের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. দুলাল জানান, তিনি শিশু খেলনা ও সাজসজ্জা সামগ্রী নিয়ে দুই দিন আগে মেলায় পৌঁছেছেন, তবে আয়োজক কমিটির অনুমতি না পেয়ে পণ্যগুলো বিক্রি করতে পারছেন না। তিনি কিস্তিতে পণ্য ক্রয় করেছেন, তাই কিস্তির দায় কে বহন করবে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
দোহার সীমা অতিক্রম করে নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর ও মানিকগঞ্জের ব্যবসায়ীরা নুরুল্লাহপুরের মেলায় অংশ নিতে আসেন। শরীয়তপুরের জমসেদ আলী জানান, গন্তব্যে পৌঁছাতে গাড়ি ভাড়া প্রায় বিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবার ব্যয়ও বাড়ছে। তিনি এক মাস আগে থেকেই মেলায় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ছিলেন, কিন্তু আয়োজকদের কাছ থেকে এখনো কোনো দোকান স্থাপনের অনুমতি না পেয়ে বিক্রয় না করে ফিরে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় আছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শালাল শাহের ভক্তদের মতে, প্রতি বছর মাঘী পূর্ণিমার দিনে কুসুমহাটি ইউনিয়নের সুন্দরীপাড়া গ্রাম থেকে নুরুল্লাহপুরে হযরত শালাল শাহের দরবারে ওরস অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশ থেকে ভক্তেরা সমবেত হন এবং ১০‑১৫ দিন পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ গ্রামীণ মেলা গড়ে ওঠে। আগামী রবিবার, ৩১ জানুয়ারি, ৪১৮তম ওরসের অনুষ্ঠান নির্ধারিত ছিল। শালাল শাহের পাশাপাশি তার বংশধর সাতজন দরবার প্রতিষ্ঠা করে ওরসের আয়োজন করেন।
মেলার আয়োজক, যিনি সাতটি দরবারের একটির তত্ত্বাবধায়ক, নাম প্রকাশ না করে জানিয়েছেন যে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর তারা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে ওরস ও মেলার অনুমতি চেয়ে গিয়েছিলেন। ডিসি ওরসের অনুমোদন দিলেও মেলার অনুমতি প্রত্যাখ্যান করেন। আয়োজক উল্লেখ করেন, শতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলমান মেলার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তারা ওরসের আগে মেলার অনুমতি পাওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করতেন, তবে এইবার অনুমতি না পেয়ে তারা হতবাক।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেলার বাতিলের ফলে স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী বাজারে সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটবে। বিক্রেতারা যেসব পণ্য নিয়ে আসেন, সেগুলোর বিক্রয় না হওয়ায় স্টক জমে থাকবে, ফলে পরবর্তী মৌসুমে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এছাড়া, গাড়ি ভাড়া, খাবার ও আবাসন খরচের মতো অতিরিক্ত ব্যয়ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক বোঝা বাড়িয়ে দেবে।
দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্পষ্ট নীতি না থাকলে এমন ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলো পুনরায় বাতিলের ঝুঁকি বাড়বে। স্থানীয় প্রশাসন ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে, জরুরি সেবা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি করা হলে ভবিষ্যতে অনুরূপ সমস্যার সম্ভাবনা কমে যাবে। বিক্রেতাদের জন্য বিকল্প বিক্রয় চ্যানেল, যেমন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা সাময়িক বাজারের ব্যবস্থা করা, ক্ষতি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, নিরাপত্তা উদ্বেগের ভিত্তিতে মেলার অনুমতি না পাওয়ায় নুরুল্লাহপুরের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা বন্ধ হয়ে ব্যবসায়ীরা উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন। এই পরিস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ মেলাগুলোর জন্য স্পষ্ট নীতি ও সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।



