ইরানের রাজধানী তেহরানে ৩০ জানুয়ারি রাত থেকে মার্কিন সরকারের সম্ভাব্য সামরিক আক্রমণের ভয় ছড়িয়ে পড়ে, ফলে শহরের বাসিন্দারা জানালা সিল করে, খাবার ও পানির সংরক্ষণে তৎপর হয়েছে। তেহরানের প্রধান শহরগুলোতে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, কখন মার্কিন সরকার কোনো আক্রমণ চালাবে, এবং তা মোকাবিলায় কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
বৃহৎ সংখ্যক পরিবার ঘরে জানালা বন্ধ করে, শেলফে নন-পরিবেশিত চাল, ডাল, তেল এবং পানির বোতল সাজিয়ে রাখছে। বাজারে তাত্ক্ষণিক চাহিদা বাড়ার ফলে মৌলিক পণ্যের দাম সাময়িকভাবে উঁচুতে উঠে, তবে সরকারী দপ্তরগুলো জরুরি সরবরাহের জন্য বিশেষ রিক্লেমেশন জারি করেছে।
একজন তেহরানীয় প্রকৌশলী জানান, “আমি পুরো রাত জেগে ছিলাম, প্রতিটি শব্দে বিস্ফোরণের আশঙ্কা করছিলাম।” তিনি আরও যোগ করেন, “শান্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত ঘুমের স্বাদই নেই।” তার বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে, আতঙ্কের মাত্রা কেবল কথায় নয়, শারীরিকভাবে মানুষের দৈনন্দিন রুটিনে প্রভাব ফেলেছে।
মার্কিন সরকারের সাম্প্রতিক বিবৃতি এবং পারস্য উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এই উদ্বেগকে তীব্র করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহিনীর ড্রোনগুলো পূর্বের তুলনায় বেশি সংখ্যায় গৃহীত হয়েছে, যা ইরানীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ানোর একটি স্পষ্ট সংকেত।
ইরান সরকার এই পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করে, তবে সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত থাকার ইঙ্গিত দেয়। ইরান সরকারের মুখপাত্র উল্লেখ করেছেন, “আমরা আন্তর্জাতিক আইনের সীমার মধ্যে থেকে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করব এবং সংলাপের পথ অনুসরণ করব।” এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার দরকারীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
বছরের পর বছর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থাকা এক বয়স্ক নাগরিক জানান, “আমি গত বছরের ইসরায়েল-ইরান সংঘর্ষের পর থেকে তিন মাসের ওষুধের স্টক রাখি, যাতে কোনো জরুরি অবস্থায় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত থাকে।” তিনি অতিরিক্তভাবে উল্লেখ করেন, “যুদ্ধের ভয়াবহতা এখনও মানুষের মনের গহ্বরে দগদগে, তাই প্রস্তুতি নেওয়া স্বাভাবিক।”
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, যিনি উত্তর তেহরানে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন, বলেন, “গত বছরের ইসরায়েলি হামলার সময়ের মতো এখন মানুষের মধ্যে মানসিক প্রস্তুতি বেশি দৃঢ়।” তবে তিনি অনলাইন বেটিং সাইটে বড় পরিমাণে বাজি ধরা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, “হামলা হবে কি না, তা নিয়ে হাজারো ডলার বাজি ধরা মানুষের জীবনকে যেন বিনোদনে পরিণত করে।” এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, সামাজিক মিডিয়া ও গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্মগুলোও এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন, যদি মার্কিন সরকার আক্রমণ চালায়, তবে তা কেবল তেহরানেই নয়, পারস্য উপসাগরের শিপিং রুট, তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনার স্থগিত হওয়া, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে, যেখানে বেশ কয়েকটি দেশ ইরান ও মার্কিন সরকারের মধ্যে সংলাপ পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, উভয় পক্ষই সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক চ্যানেলকে শক্তিশালী করে, তেহরানের নাগরিকদের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত।
সারসংক্ষেপে, তেহরানের সাধারণ মানুষ এখন এক ধরনের দ্বৈত সংকটে রয়েছে: একদিকে সম্ভাব্য মার্কিন আক্রমণের ভয়, অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিকতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা। জরুরি খাদ্য ও পানির মজুদ, ওষুধের সংরক্ষণ এবং মানসিক প্রস্তুতি এই অস্থির সময়ে মানুষের বেঁচে থাকার মূল কৌশল হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় হস্তক্ষেপ এবং কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়া পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।



