১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে সাংবাদিকদের জন্য ইলেকশন কমিশন (ইসি) অনলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করেছিল। তবে বৃহস্পতিবারের পরে এই পদ্ধতি থেকে সরে এসে, প্রায় ১৪,০০০ সাংবাদিকের ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের মূল বিষয় হল, নিবন্ধনের সময় জমা দেওয়া নাম, মোবাইল নম্বর, এনআইডি ইত্যাদি তথ্য সাইটে সরাসরি দেখা যায়।
ইসির এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল, নির্বাচনী পর্যবেক্ষণে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের পরিচয় যাচাই করে তাদেরকে পর্যবেক্ষক পাস প্রদান করা। অনলাইন ফর্মে নাম, ফোন, এনআইডি নম্বর এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং অনুমোদনের পরই পাস জারি করা হতো। তবে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।
সাংবাদিক গোষ্ঠী দাবি করে যে, ইসির সিস্টেমে জমা দেওয়া সব তথ্য উন্মুক্তভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে, ফলে যে কেউ সহজেই এই ডেটা ডাউনলোড করতে পারবে। এ ধরনের প্রকাশের ফলে তথ্যের অপব্যবহার এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়ছে বলে তারা সতর্কতা প্রকাশ করেছে।
ঢাকা পোস্টের সিনিয়র সাংবাদিক সাঈদ রিপন উল্লেখ করেন, তার অফিসের বেশ কয়েকজন সাংবাদিক অনলাইনে নিবন্ধন করেছিল এবং অনুমোদনের অবস্থা জানার জন্য বিকেল চারটায় সাইটে প্রবেশের চেষ্টা করেন। সাইটে প্রবেশের সময় তারা নিজেদের এনআইডি, মোবাইল নম্বর এবং আবেদন কপির সম্পূর্ণ বিবরণ উন্মুক্তভাবে দেখতে পেয়েছেন।
ইসির সচিবালয়ের জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক জানান, যদিও তথ্য উন্মুক্তভাবে দেখা যায়, তবু কোনো তথ্য ফাঁস হয়নি। তিনি ব্যাখ্যা করেন, পর্যবেক্ষক পাসের জন্য চালু থাকা কার্ডটি বন্ধ করা হয়েছে, তবে আইটি টিমের কাজের সময় সার্ভার সাময়িকভাবে খোলা থাকায় অ্যাডমিন প্যানেল দৃশ্যমান হয়ে যায়।
মল্লিকের মতে, সাইটটি বন্ধ করার সময় সার্ভার পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়ায় কয়েক মিনিটের জন্য অ্যাডমিন প্যানেল অ্যাক্সেসযোগ্য হয়ে যায়, ফলে ব্যবহারকারীরা প্যানেলের ভিতরের তথ্য দেখতে পায়। এই অস্থায়ী উন্মুক্ততা নিয়ে কেউ হ্যাকিং বা তথ্য চুরির অভিযোগ তুলেছে, তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো ডেটা চুরি হয়নি।
প্রকাশিত স্ক্রিনশটে দেখা যায়, নিবন্ধনকারী কিছু সাংবাদিকের নাম, ফোন নম্বর, নিবন্ধনের তারিখ এবং এনআইডি নম্বর স্পষ্টভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। এছাড়াও সাইটের অ্যাডমিন প্যানেলে কিছু ফিচার ব্যবহার করার সুযোগও দেখা যায়, যা তথ্যের অপ্রয়োজনীয় প্রকাশের ইঙ্গিত দেয়।
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এই বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না বলে জানান, এবং তিনি বিষয়টি জানার পরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি উল্লেখ করেন, তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইটি টিমকে ত্বরিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সাঈদ রিপন স্ক্রিনশটের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এমন ঘটনা ঘটতে পারে এবং তিনি হ্যাকিংয়ের সম্ভাবনা বাদ দেন না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তথ্যের অস্থায়ী উন্মুক্ততা সিস্টেমের ত্রুটি থেকে উদ্ভূত এবং তা দ্রুত সমাধান করা দরকার।
এই ঘটনার ফলে ইসির তথ্য নিরাপত্তা নীতি নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনার তীব্রতা বাড়তে পারে, বিশেষত নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী দল এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইসির উপর অতিরিক্ত তদারকি এবং ডেটা সুরক্ষার জন্য কঠোর শর্ত আরোপের দাবি জানাতে পারে।
ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ভবিষ্যতে অনলাইন নিবন্ধন সিস্টেমে অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর যুক্ত করা হবে এবং অ্যাডমিন প্যানেলের অ্যাক্সেস সীমিত করা হবে। এছাড়া, তথ্য ফাঁসের কোনো প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত বিষয়টি তদন্তের আওতায় রাখা হবে।
সামগ্রিকভাবে, ১৪,০০০ সাংবাদিকের তথ্য উন্মুক্ত হওয়ার অভিযোগ ইসির প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, যা নির্বাচনী সময়ে মিডিয়া স্বাধীনতা ও তথ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।



