শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা‑এর ধানমন্ডি এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) মিলনায়তে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনায় দেশের বর্তমান মানবাধিকার অবস্থার বিশ্লেষণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ উপস্থাপিত হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সভাপতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
সিম্পোজিয়ামের সূচনায় চৌধুরী বিচারপতি উল্লেখ করেন, স্বৈরাচারী শাসনের সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা করা কোনো অন্যায়কে কমিয়ে দেখার সুযোগ দেয় না। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা, নির্যাতন, হয়রানি এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে নাম জড়ানোর প্রবণতা মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ দেয় না। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় এমন একটি বিচার ব্যবস্থা দরকার, যা ভয় বা পক্ষপাত ছাড়াই ন্যায়সঙ্গত রায় দিতে সক্ষম।
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধানের মূল স্তম্ভ হল বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রতা। জনগণের ধারণা যদি এই স্বাধীনতা সম্পর্কে সন্দেহপূর্ণ হয়, তবে বিচার বিভাগের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। অতীতের শাসনামলে গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে বিচার বিভাগ যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেনি, এ কথাটি চৌধুরী বিচারপতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা প্রদর্শিত হয়েছে, এ কথাও তিনি উল্লেখ করেন। গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তির পরিবারকে অন্ধকারে ফেলে দেয়, সামাজিক কলঙ্ক, আর্থিক ক্ষতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি করে। মৃত্যুর পর পরিবার শোক এবং ধর্মীয় বিধি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারে, কিন্তু গুমের শিকার হলে পরিবারের কাছে কোনো তথ্য না থাকায় তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞাত অবস্থায় থাকে।
চৌধুরী বিচারপতি আরও বলেন, গুমের ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা যে নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছেন, তা মানবিকতার নষ্টের স্পষ্ট উদাহরণ। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) অধ্যাদেশ ২০০৯ সালের এনএইচআরসি আইনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। নতুন অধ্যাদেশে ১৯৯৩ সালের প্যারিস নীতিমালার অধিকাংশ নীতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা পূর্বের আইনকে কার্যকরী, শক্তিশালী এবং প্রয়োগযোগ্য করে তুলেছে।
পূর্বের আইনটি ত্রুটিপূর্ণ বলে চৌধুরী বিচারপতি ব্যাখ্যা করেন; এতে কার্যকারিতা, শক্তি এবং প্রয়োগের ঘাটতি ছিল, ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকারদের সুরক্ষা এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।
সেমিনারে উপস্থিত অন্যান্য বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক দিক হিসেবে স্বীকৃতি দেন, তবে একই সঙ্গে বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা জোর দিয়ে বলেন, আইনগত কাঠামো শক্তিশালী হলেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হলে মানবাধিকার রক্ষার লক্ষ্য অর্জিত হবে না।
বক্তারা ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে উল্লেখ করেন, গুমের মতো গুরুতর লঙ্ঘন রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বচ্ছতা, তথ্যের স্বতন্ত্র প্রবাহ এবং স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। এছাড়া, বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করতে আইনসভা ও নির্বাহী শাখার থেকে হস্তক্ষেপ দূর করা জরুরি, যাতে জনগণ ন্যায়বিচারকে বিশ্বাস করতে পারে।
সিম্পোজিয়ামের সমাপনী বক্তব্যে চৌধুরী বিচারপতি পুনরায় জোর দেন, মানবাধিকার রক্ষার জন্য একটি স্বাধীন, স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলা দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি মজবুত করার অন্যতম মূল চাবিকাঠি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন এনএইচআরসি অধ্যাদেশের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে গুমসহ অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকারদের জন্য ন্যায়সঙ্গত সমাধান সম্ভব হবে।
এই আলোচনার পর, অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নত করতে শুধু আইনগত সংস্কারই নয়, সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধি, মিডিয়ার স্বাধীনতা এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে এমন সেমিনার এবং জনসচেতনতা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া উচিত, যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে জাতীয় অগ্রাধিকারে রাখা যায়।



