কাঠমান্ডু জেলা আদালত US‑Bangla এয়ারলাইন্সের ২০১৮ সালের নেপাল বিমান দুর্ঘটনার জন্য আন্তর্জাতিক দায়সীমা অতিক্রম করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রদান করেছে। ১২ মার্চ ২০১৮ তারিখে ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করা ৭৬ আসনের বোম্বার্ডিয়ার ড্যাশ‑৮ কিউ‑৪০০, নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় অগ্নিকাণ্ডে জ্বলে ৫১ জনের প্রাণ নেওয়া হয়। ভুক্তভোগীর মধ্যে ২২ জন নেপালি, ২৮ জন বাংলাদেশি এবং একজন চীনা নাগরিক ছিলেন।
দুর্ঘটনা ঘটার পর ১৬টি মৃত যাত্রীর পরিবার এবং একজন বেঁচে থাকা যাত্রী মামলাটি দায়ের করেন। বিচারক দিবাকর ভট্টের নেতৃত্বে আদালত ২০ জুলাই রায় ঘোষণা করে এবং ২০ জানুয়ারি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে। রায়ে বলা হয়েছে যে, পাইলট ও ফ্লাইট অফিসারের অবহেলা এবং বেপরোয়া আচরণ দুর্ঘটনার মূল কারণ, ফলে এয়ারলাইনের দায় সীমা অতিক্রম করে।
আদালত উল্লেখ করেছে যে, ১৯২৯ সালের ওয়ারস কনভেনশন এবং ১৯৫৫ সালের হেগে সংশোধিত ওয়ারস কনভেনশন অনুযায়ী যাত্রীদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কনভেনশনের ধারা ২২-এ ক্ষতিপূরণের ভিত্তি নির্ধারিত হলেও, ধারা ২৫ অনুযায়ী ইচ্ছাকৃত ক্ষতি বা বেপরোয়া আচরণের ফলে সৃষ্ট ক্ষতির ক্ষেত্রে দায়সীমা প্রযোজ্য হয় না। এই রায় অনুসারে US‑Bangla এয়ারলাইন্সের দায় সীমা অতিক্রম করে, ফলে ভুক্তভোগীর সামাজিক ও আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হবে।
এই রায় নেপালের এভিয়েশন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক দায়সীমা অতিক্রম করে কোনো এয়ারলাইনের বিরুদ্ধে দায়িত্ব আরোপের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী এয়ারলাইনগুলোর নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতা সম্পর্কে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে। “যদি কোনো এয়ারলাইন অবহেলা বা বেপরোয়া আচরণে জড়িত থাকে, তবে দায়সীমা অতিক্রম করা স্বাভাবিক,” এমন মন্তব্য করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলায় রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।
বঙ্গ ও নেপালের কূটনৈতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে এই রায় দু’দেশের মধ্যে সমন্বয় ও সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলেছে। দু’দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য সমন্বয় সভা চালু করেছে এবং ভুক্তভোগীর পরিবারকে যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে, US‑Bangla এয়ারলাইন্সের মালিকানার কাঠামো ও আন্তর্জাতিক রেজিস্ট্রেশন নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে এয়ারলাইনগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, ওয়ারস কনভেনশন ও হেগে প্রোটোকল অনুযায়ী নির্ধারিত দায়সীমা বহু দেশে বিমানের দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে এই রায়ে দেখা যায় যে, অবহেলা ও বেপরোয়া আচরণকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে দায়সীমা অতিক্রমের বিধান প্রয়োগ করা হয়েছে। এ ধরনের রায় অন্যান্য দেশের আদালতেও প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে যেখানে একই ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রযোজ্য।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, এই রায়ের পরবর্তী ধাপ হবে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ এবং তা ভুক্তভোগীর পরিবারে বিতরণ। আদালত রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মৃত্যুর পর নির্ভরশীলদের সরাসরি ও পরোক্ষ ক্ষতিও বিবেচনা করা হবে, যা দায়সীমার আওতায় না থাকলেও অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণে অন্তর্ভুক্ত হবে। তাই, ক্ষতিপূরণ গণনা করতে ভুক্তভোগীর সামাজিক অবস্থা, আয় এবং পরিবারের আর্থিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা হবে।
US‑Bangla এয়ারলাইন্সের জন্য এই রায়ের অর্থনৈতিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং ভবিষ্যতে বিমানের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা (ICAO) এবং এয়ারলাইন শিল্পের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এই রায়কে নজরে রেখে নিরাপত্তা মানদণ্ড ও দায়বদ্ধতা নীতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, কাঠমান্ডু জেলা আদালতের রায় নেপাল ও বাংলাদেশ উভয়ের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি মাইলফলক। এটি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংক্রান্ত দায়সীমা ও ক্ষতিপূরণ নীতির পুনঃমূল্যায়নকে ত্বরান্বিত করবে এবং ভুক্তভোগীর পরিবারকে ন্যায়সঙ্গত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলায় এই রায়ের প্রভাব কীভাবে প্রকাশ পাবে, তা আন্তর্জাতিক আইন ও বিমান নিরাপত্তা নীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



