বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানুয়ারি মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ৬৪টি নির্বাচনি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এ ঘটনায় চারজনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ৫০৯ জন আহত হয়েছে। একই সময়ে ডিসেম্বর মাসে সাতটি সহিংসতা ঘটলেও মাত্র একজন নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছেন।
এমএসএফের মাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে জানুয়ারি মাসের নির্বাচনি সহিংসতাকে দেশের সর্বোচ্চ মানবাধিকার সংকটের একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি মাসে অতিরিক্ত ২৪টি রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটেছে, যার ফলে ২১৫ জন আহত হয়েছে এবং ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
পূর্ববর্তী মাসে, অর্থাৎ ডিসেম্বরের তুলনায়, রাজনৈতিক সহিংসতার সংখ্যা কমে ১৬টি ঘটেছে, তবে এতে ১২৪ জন আহত এবং চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের ফলে ঘটেছে।
ময়মনসিংহের ধোবাউড়া এরশাদ বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক নজরুল ইসলাম নির্বাচনি সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। একইভাবে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় জামায়াত-এ-ইসলামির সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে ইটের গুলিতে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের কটিয়াদি উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নে, বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য মো. কামাল উদ্দিনের মৃত্যু ঘটেছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চনে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজাহর নামেও একজন নিহত হয়েছেন।
মোট ৬৪টি নির্বাচনি সহিংসতার মধ্যে ৩৩টি ঘটনা বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামির মধ্যে সংঘর্ষের ফল। এছাড়া ১৩টি ঘটনা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ, ৯টি ঘটনা স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, একটি ঘটনা গণঅধিকার পরিষদ-স্বতন্ত্রের এবং একটি ঘটনা বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ঘটেছে।
২৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে ১৬টি ঘটনা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধের ফলে, দুইটি ঘটনা বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে, এবং পাঁচটি ঘটনা বিএনপি-জামায়াত-এ-ইসলামির মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। এই সব ঘটনায় নিহত ছয়জনের সবাই বিএনপির কর্মী বা সমর্থক।
কারাবন্দীদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে জানুয়ারিতে মোট ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত মাসের নয়জনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এ মৃত্যুর মধ্যে চারজন কনভিক্ট এবং এগারোজন হজতিতে ছিলেন। হজতিতে থাকা এই একরাশের মধ্যে পাঁচজন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী।
কারাগারভিত্তিক মৃত্যুর বিশদে দেখা যায়, কেরাণীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দুইজন এবং গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনা মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টিতে কারাবন্দীদের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সেবা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনি সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে দলীয় কর্মীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধ এবং নির্বাচনী সময়সূচি নিয়ে অমিল উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামির মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা এই সংঘর্ষকে তীব্র করেছে।
দলীয় নেতারা ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। বিএনপি উল্লেখ করেছে যে তার কর্মীদের ওপর আক্রমণ বাড়ছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। জামায়াত-এ-ইসলামি পক্ষেরও একই রকম অভিযোগে বলা হয়েছে যে তাদের সমর্থকদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, এই ধরণের সহিংসতা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে এবং ভোটারদের অংশগ্রহণের ইচ্ছা কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়া, কারাবন্দীদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়া বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি এখনই নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ বাড়ানো এবং কারাবন্দীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে। পরবর্তী সপ্তাহে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদারকি সভা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে এই সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়ে আলোচনা হবে।



