শুক্রবার ভোরে গাজা শহরের পশ্চিমে অবস্থিত শেখ রাদওয়ান পুলিশ স্টেশন এবং আশ্রয়প্রাপ্ত শিবিরে ইসরাইলি বিমান আক্রমণ চালায়, যার ফলে অন্তত ২৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শিবিরে নিহতের সংখ্যা ১৩-এ বৃদ্ধি পায় এবং মোট মৃতসংখ্যা ২৯-এ পৌঁছায়। একই সময়ে গাজা সিটির আরেকটি অ্যাপার্টমেন্টে আরেকটি বিমান হামলা হয়, যেখানে তিনটি শিশুরা এবং দুইজন নারী প্রাণ হারায়।
হামাসের নিয়ন্ত্রণে থাকা গাজা অঞ্চলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র বিমান আক্রমণ এই ছিল, যদিও ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর করা হয়েছিল। যুদ্ধবিরতির শর্তের পর থেকে ইজরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর আক্রমণে ৫০০‑এরও বেশি বেসামরিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে একটি পুলিশ স্টেশন, কয়েকটি আবাসিক ভবন এবং বাস্তুচ্যুতদের শিবির অন্তর্ভুক্ত ছিল। শিবিরে থাকা বাস্তুচ্যুতদের টেন্টে থাকা লোকজনের মধ্যে সাতজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া, রাফার টানেল থেকে বেরিয়ে আসা আটজন বন্দুকধারীকে ইজরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী শনাক্ত করে, তিনজনকে গুলি করে হত্যা করে এবং চতুর্থজনকে গ্রেপ্তার করে, যাকে হামাসের শীর্ষ কমান্ডার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন, গাজা অঞ্চলে চলমান সংঘাতের ফলে মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি পাচ্ছে এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন অঞ্চলীয় স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একটি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “যুদ্ধবিরতির পরেও উভয় পক্ষের আক্রমণ অব্যাহত থাকলে শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা কমে যায় এবং গাজার নাগরিকদের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে।”
ইসরাইলের দৃষ্টিকোণ থেকে, রাফার টানেল থেকে বেরিয়ে আসা সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই আক্রমণগুলোকে নিরাপত্তা রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক আক্রমণে নিহত ফিলিস্তিনিদের অধিকাংশই বেসামরিক, যার মধ্যে শিশুরা ও নারীরা অন্তর্ভুক্ত।
যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগে ইসরাইলকে দায়ী করে হামাস কোনো মন্তব্য করেনি, তবে গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা যুক্তি দেন যে যুদ্ধবিরতি পরবর্তী সময়ে বেসামরিক প্রাণহানির হার বৃদ্ধি পেয়েছে। ইজরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুসারে, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ফিলিস্তিনি হামলাকারীরা চারজন ইসরাইলি সৈনিককে হত্যা করেছে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা গাজার প্রবেশপথের সীমাবদ্ধতা এবং শিবিরে বাস্তুচ্যুতদের অবস্থানকে মানবিক সংকটের মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন। গাজার প্রধান প্রবেশপথের ওপর সীমাবদ্ধতা এবং শিবিরে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে চিকিৎসা সুবিধা ও মৌলিক সেবার অভাব বাড়ছে।
ইউ.এস.এর মধ্যস্থতায় গঠিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও উভয় পক্ষের আক্রমণ অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গাজা ও ইসরাইলের মধ্যে তীব্র সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে এবং মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর জন্য নিরাপদ পথ নিশ্চিত করার দাবি করেছে।
গাজা শহরের আল শিফা হাসপাতালের সূত্র অনুযায়ী, আহতদের জন্য জরুরি চিকিৎসা সুবিধা সীমিত এবং হাসপাতালের সরবরাহ শৃঙ্খলেও ব্যাঘাত দেখা দিচ্ছে। হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানান, শিবিরে আঘাতপ্রাপ্ত শিশু ও নারীদের তীব্র চিকিৎসা প্রয়োজন, তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতির কারণে সেবা প্রদান কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা গাজায় জরুরি সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও প্রবেশপথের সীমাবদ্ধতা তাদের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। গাজার নাগরিকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও মৌলিক সেবার অভাব অব্যাহত থাকায় মানবিক সংকটের মাত্রা বাড়ছে।
সামগ্রিকভাবে, গাজা অঞ্চলে চলমান আকাশীয় হামলা এবং ভূমি সংঘাতের ফলে বেসামরিক প্রাণহানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা যুদ্ধবিরতি চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ এবং মানবিক সাহায্যের প্রয়োজনের মধ্যে ইসরাইল ও হামাসের পরবর্তী পদক্ষেপ গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।



