ইজরায়েলি সরকার ইরানের শাসন পরিবর্তনের সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে গোপনীয় আলোচনায় লিপ্ত, আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, যেখানে দু’দেশের কূটনৈতিক মিথস্ক্রিয়া সাম্প্রতিক সপ্তাহে তীব্রতর হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ার গুজবের মাঝেও ইজরায়েলি সরকার ও তার প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্য মন্তব্য কমই শোনা যায়। এই মাসে ইরানের বিরোধী প্রতিবাদকে সমর্থন জানানো কয়েকটি মন্তব্য ছাড়া, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তার সরকার কোনো প্রকাশ্য বিবৃতি দেননি।
ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থায় ২৫ বছর কাজ করা ড্যানি সিট্রিনোভিচ, যিনি বর্তমানে ইজরায়েলি ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজে সিনিয়র ইরান গবেষক, বলেন, “বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই মুহূর্তকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন তা এই নীরবতা থেকেই বোঝা যায়।” তিনি যুক্তি দেন, গাল্ফে মার্কিন বাহিনীর বিশাল উপস্থিতি ও ট্রাম্পের ইরান আক্রমণের সম্ভাবনা এই সময়কে নেতানিয়াহুর জন্য এক স্বর্ণের সুযোগ করে তুলেছে।
ইজরায়েলি সিগন্যাল গোয়েন্দা ইউনিটের প্রাক্তন ডেপুটি ডিরেক্টর আসাফ কোহেনও একই নীরবতার কৌশলকে উল্লেখ করে বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি এইবার আমেরিকানদের নেতৃত্বে চলা উচিত, কারণ তারা শক্তিশালী, সক্ষমতা বেশি এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে অধিক বৈধতা রাখে।” তার মন্তব্য ইজরায়েলি নেতৃত্বের কূটনৈতিক পদ্ধতিকে স্পষ্ট করে।
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে ইজরায়েলের সর্ববৃহৎ নিরাপত্তা হুমকি ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার মূল উৎস হিসেবে দেখেছেন। যদিও প্রকাশ্যভাবে নীরবতা বজায় রেখেছেন, তবে তার গোপনীয় আলোচনার কোনো ঘাটতি নেই বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
এই সপ্তাহে ইজরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা প্রধান শ্লোমি বাইন্ডার ওয়াশিংটনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইজরায়েলি মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বৈঠকে ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে।
সিট্রিনোভিচের মতে, শ্লোমি বাইন্ডারের এই মিটিং ইরানের শাসন পরিবর্তনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ মাত্রার আক্রমণ চালাতে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন, নেতানিয়াহু পূর্বে ট্রাম্পকে আক্রমণ স্থগিত করতে অনুরোধ করেছিলেন, কারণ পরিকল্পিত মার্কিন আক্রমণকে তিনি “অনেক ছোট” বলে মূল্যায়ন করেন।
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু অতীতে ইরানীয় জনগণকে তাদের শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন। ফক্স নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানিদেরকে “উঠে দাঁড়াতে” বলেছিলেন, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে উস্কে দিতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপের পর্যালোচনা করছেন, যার মধ্যে সাইবার আক্রমণসহ বহু বিকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রাম ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর লক্ষ্য রাখবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
ইজরায়েলি সরকার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সমন্বিত কৌশল ইরানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে পরিবর্তন করতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনবে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে তা অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
অবশ্যই, ইরানের শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা ইজরায়েলি সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিদ্যাকে প্রভাবিত করবে। নীতিনির্ধারকরা এখনো স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেননি যে তারা কীভাবে এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে পরিচালনা করবেন, তবে গোপনীয় আলোচনার তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হবে।
সারসংক্ষেপে, ইজরায়েলি সরকার ইরানের শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখছে, আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তই এই পরিকল্পনার সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হবে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতিতে নতুন মোড় আনতে পারে, যা বিশ্ব রাজনীতির পরবর্তী অধ্যায়কে গঠন করবে।



