শফিকুর রহমান, জামায়াত-এ-ইসলামির আমির, শনিবার বিকেল দু’টায় দাউদকান্দি কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত কুমিল্লা‑১ আসনের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন। তিনি মা‑বোনদের রাস্তায় দেখা মাত্র কাপড় খুলে ফেলার হুমকি দেওয়া ব্যক্তিদের মানব প্রজাতির অংশ নয় বলে স্পষ্ট মন্তব্য করেন। এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইলেকশনের পূর্বে এমন মন্তব্যের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সতর্কতা জানান।
সভা আয়োজন করা হয়েছিল ১১ দলীয় জোট সমর্থিত মনিরুজ্জামান বাহলুলের সমর্থনে, যেখানে শফিকুর রহমানের ভাষণ মূলত নিরাপত্তা ও নৈতিকতার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে গঠিত। তিনি উপস্থিত ভক্তদের জানিয়ে দেন, যেসব ব্যক্তি নারী ও মায়ের নিরাপত্তা হুমকি দেয়, তারা সমাজের মৌলিক মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার মতে, এমন আচরণ ইলেকশনের পরেও সমাজে বিশাল ক্ষতি করতে পারে।
শফিকুর রহমানের মতে, দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য বাংলাদেশকে স্বাধীন, স্বনির্ভর ও সমান অধিকারযুক্ত রাষ্ট্রে রূপান্তর করা জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো বিদেশি শাসক বা স্বার্থের অধীন না থেকে, দেশের সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। এ লক্ষ্যে তিনি সংবিধানের সঠিক প্রয়োগের দাবি তোলেন, যা বর্তমানে কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দ্বারা বিকৃত হয়ে আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অধিকন্তু, তিনি রাজনৈতিক দুর্নীতি, সম্পদ চুরি, লুটপাট এবং বিদেশে অবৈধ সম্পদ সঞ্চয়কে তীব্রভাবে নিন্দা করেন। তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ড দেশের মানুষকে বিপদে ফেলেছে এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে নষ্ট করেছে। তার ভাষণে উল্লেখ করা হয়েছে, “সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংবিধান ও আটারো কোটি মানুষের উপর জুলুম করা হয়েছে” – যা বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রতি তার তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে।
শফিকুর রহমান ৫ আগস্টের পরের রাজনৈতিক পরিবেশের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, সেই তারিখের আগে দেশের রূপান্তর ও সন্ত্রাস, ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতি, ব্যাংক লুট ইত্যাদি ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই ঘটনাগুলো নারী ও যুবকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছে। তবে, তিনি যোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী আত্মসমালোচনা করেছে, আবার কিছু গোষ্ঠী এখনও পরিবর্তন না দেখিয়েছে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে তিনি অযৌক্তিক ও অপ্রায়োগিক অঙ্গীকার থেকে বিরত থাকার কথা জানান। তিনি বলেন, সরকার বাস্তবায়নের সামর্থ্য না থাকা প্রতিশ্রুতি দেবে না, বরং ন্যায়বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধ নাগরিকদের কল্যাণের দিকে মনোযোগ দেবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি ভোটারদের কাছে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা উপস্থাপন করার আহ্বান জানান।
শফিকুরের মন্তব্যের প্রতি বিরোধী দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা যায়, কিছু বিশ্লেষক তার ভাষ্যকে অতিরিক্ত রেডিক্যাল এবং নির্বাচনী কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। তারা যুক্তি দেন, নারী নিরাপত্তা সংক্রান্ত তীব্র ভাষ্য ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে, তবে তা সামাজিক সংহতি বজায় রাখতে সহায়ক নাও হতে পারে। অন্যদিকে, তার সমর্থকরা তার বক্তব্যকে নৈতিক মানদণ্ড রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে প্রশংসা করছেন।
আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে শফিকুরের এই বক্তব্য রাজনৈতিক আলোচনার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি যে দলীয় জোটের সমর্থনে উপস্থিত ছিলেন, তা তার মন্তব্যের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে তার পার্টির নীতি ও লক্ষ্য স্পষ্ট করতে চেয়েছে। বিশেষত, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা সংক্রান্ত তার কঠোর অবস্থান নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, শফিকুর রহমানের ভাষণ নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য একটি রূপরেখা উপস্থাপন করেছে। তার মন্তব্যের প্রভাব কীভাবে ভোটের ফলাফলে প্রতিফলিত হবে, তা এখনও অনিশ্চিত, তবে ইলেকশন পূর্বের এই ধরনের উন্মুক্ত আলোচনা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন দৃষ্টিকোণ এনে দিয়েছে।



