লন্ডনের হাই কোর্ট সোমবার সাউদি আরবকে গ্যানেম আল-মাসারিরের বিরুদ্ধে হ্যাকিং ও শারীরিক হামলার জন্য ৩ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ জানায়। আল-মাসারির, যিনি সাউদি রাজপরিবারের সমালোচক হিসেবে ইউটিউবে বিশাল দর্শকসংখ্যা অর্জন করছিলেন, তার ফোনে অস্বাভাবিক ধীরগতি ও ব্যাটারি দ্রুত শেষ হওয়া লক্ষ করা গিয়েছিল। আদালতের রায় অনুযায়ী, সাউদি সরকারই এই হ্যাকিং ও পরবর্তী আক্রমণের মূল দায়ী।
গ্যানেম আল-মাসারির, ওয়েম্বলি এলাকায় একটি ফ্ল্যাটে বসবাসকারী, তার চিত্তাকর্ষক ও কখনও কখনও আপত্তিকর হাস্যরসের মাধ্যমে সাউদি রাজপরিবারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতেন। তার চ্যানেল কয়েক শত মিলিয়ন ভিউ অর্জন করছিল এবং সমর্থক ও সমালোচক উভয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। তবে তার তীক্ষ্ণ সমালোচনা শক্তিশালী বিরোধী গোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।
২০১৮ সালে আল-মাসারিরের ফোনে অস্বাভাবিক ধীরগতি ও ব্যাটারি দ্রুত শেষ হওয়া শুরু হয়। তিনি লক্ষ্য করেন যে ফোনের পারফরম্যান্স হঠাৎ করে কমে গিয়েছে এবং চার্জ দ্রুত শেষ হয়ে যায়। এই সমস্যাগুলি পরবর্তীতে হ্যাকিংয়ের সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
একই সময়ে, লন্ডনের বিভিন্ন স্থানে একই মুখের মানুষগুলোকে আল-মাসারিরের সামনে উপস্থিত হতে দেখা যায়। তারা তাকে রাস্তায় থামিয়ে প্রশ্ন করে, ভিডিও রেকর্ড করে এবং হুমকি দেয়। এই ব্যক্তিরা সাউদি সরকারের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং আল-মাসারিরের চলাচল ট্র্যাক করার ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ বাড়ে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আল-মাসারিরের আইফোন ২০১৮ সালে তিনটি টেক্সট মেসেজের লিঙ্কে ক্লিক করার পর হ্যাক হয়। ঐ লিঙ্কগুলো সংবাদ সংস্থার বিশেষ সদস্যপদ অফার বলে ভান করে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হ্যাকিংয়ের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত পেগাসাস টুল ব্যবহার করা হয়েছিল, যা ফোনের অবস্থান, ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা রাখে।
আগস্ট ২০১৮-এ লন্ডনের কেন্দ্রীয় এলাকায় আল-মাসারিরের উপর শারীরিক হামলা ঘটে। দুই অপরিচিত ব্যক্তি তাকে থামিয়ে সাউদি রাজপরিবারের সমালোচনা নিয়ে প্রশ্ন করে এবং মুখে আঘাত হানেন। হ্যাঁ, তারা তাকে “কাতারের দাস” বলে অভিহিত করে এবং “একটি শিক্ষা” দিতে চায় বলে দাবি করে। আশেপাশের পথচারীরা হস্তক্ষেপ করে, তবে আক্রমণকারীরা তৎক্ষণাৎ সরে যান।
আল-মাসারিরের বিরুদ্ধে এই আক্রমণ ও হ্যাকিং নিয়ে ছয় বছর ধরে আইনি লড়াই চলেছে। হাই কোর্টে উভয় পক্ষের প্রমাণ উপস্থাপিত হয়, যার মধ্যে হ্যাকিংয়ের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও আক্রমণের সাক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত। আদালত হ্যাকিং ও শারীরিক আক্রমণের সংযোগ স্থাপন করে এবং সাউদি আরবকে দায়ী করে।
রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে সাউদি সরকার হ্যাকিংয়ের সরাসরি দায়ী এবং আক্রমণটি পূর্ব পরিকল্পিত ছিল। আদালত এক আক্রমণকারীকে ইয়ারপিস (earpiece) পরা অবস্থায় দেখেছে, যা সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার ইঙ্গিত দেয়। ফলে সাউদি সরকারকে আল-মাসারিরকে মোট ৩.১ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ দেওয়া হয়।
এই রায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পেগাসাস হ্যাকিং টুলের ব্যবহার নিয়ে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে এই ধরনের সাইবার হুমকি মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করে। লন্ডনের এই মামলায় সাউদি সরকারের সরাসরি দায়িত্ব প্রমাণিত হওয়ায় অন্যান্য দেশের সাইবার নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
আল-মাসারিরের মামলা এখন সাইবার নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে অনুরূপ হ্যাকিং ও শারীরিক হুমকির বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা বাড়াতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কঠোর আইন প্রয়োগের আহ্বান বাড়বে।



