দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বিভাগ (ডিআইআরসিও) শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ইজরায়েলি দূত অ্যারিয়েল সেইডম্যানকে অবাঞ্ছিত (পারসোনা নন গ্রাটা) ঘোষণা করে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ত্যাগের নির্দেশ দেয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে কূটনৈতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন এবং দক্ষিণ আফ্রিকান রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি অসম্মানমূলক আচরণ রয়েছে।
ডিআইআরসিও উল্লেখ করে যে, সেইডম্যানের সামাজিক মিডিয়া পোস্টগুলো প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার প্রতি আক্রমণাত্মক স্বর ব্যবহার করেছে, যা একটি স্বাধীন দেশের শীর্ষ কর্মকর্তার মর্যাদাকে আঘাত করে। এছাড়া, তিনি ইজরায়েলি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দক্ষিণ আফ্রিকায় সফরের বিষয়ে প্রটোকল অনুসারে পূর্বে অবহিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বিভাগের মতে, এই ধরনের অবহেলা কূটনৈতিক সুবিধার অপব্যবহার এবং ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের মৌলিক নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। ডিআইআরসিও জোর দিয়ে বলেছে যে, এই ধারাবাহিক আচরণ দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য অপরিহার্য আস্থা ও প্রটোকলকে ক্ষুণ্ন করেছে।
ইজরায়েলি সরকার দ্রুতই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকান জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক শন এডওয়ার্ড বাইনোভেল্টকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে একই ৭২ ঘণ্টার সময়সীমার মধ্যে দেশ ত্যাগের আদেশ দেয়। বাইনোভেল্ট, যিনি গাজা যুদ্ধের পর গৃহীত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইজরায়েলি সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলায় যুক্ত ছিলেন, রামাল্লায় অবস্থিত দক্ষিণ আফ্রিকান অফিস থেকে কাজ করছিলেন।
দক্ষিণ আফ্রিকান কূটনৈতিক মন্ত্রণালয় বাইনোভেল্টের ত্যাগের নির্দেশকে ইজরায়েলি সরকারের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করেছে। একই সঙ্গে, ইজরায়েলি সরকার দক্ষিণ আফ্রিকান সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের অবস্থান রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
দুই দেশের এই পারস্পরিক বহিষ্কার গাজা যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকান সরকার ইজরায়েলি সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা দায়ের করার পর থেকে তীব্রতর হয়েছে। সেই মামলার ফলে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ইতিমধ্যে নিম্নগামী পথে ছিল, এবং বর্তমান পদক্ষেপগুলো তা আরও তীব্র করে তুলেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকান কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন যে, ইজরায়েলি দূতাবাসের আচরণ একটি বৃহত্তর ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রবণতার অংশ, যা দীর্ঘদিনের ইজরায়েল-বিরোধী মনোভাবের সঙ্গে যুক্ত। তারা দাবি করেন যে, এমন আচরণ দ্বিপক্ষীয় আস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও প্রোটোকলকে ক্ষয় করে।
ইজরায়েলি সরকার, যদিও দক্ষিণ আফ্রিকান কূটনীতিকের বহিষ্কারের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে, তবু এই পদক্ষেপকে দক্ষিণ আফ্রিকান পক্ষের অবৈধ অভিযোগ ও শত্রুতাপূর্ণ পরিবেশের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, কূটনৈতিক সম্পর্কের কোনো লঙ্ঘন হলে সমানভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোই আন্তর্জাতিক নীতির অধীনে স্বাভাবিক।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন যে, এই পারস্পরিক বহিষ্কার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটাতে পারে, যার ফলে কূটনৈতিক সংলাপ স্থগিত, বাণিজ্যিক সহযোগিতা হ্রাস এবং উন্নয়ন প্রকল্পে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। উভয় দেশের সরকারই এখন এই উত্তেজনা কমাতে নিম্নস্তরের কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করতে পারে।
প্রেটোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, যদি কূটনৈতিক নিয়মের লঙ্ঘন অব্যাহত থাকে, তবে বিদ্যমান চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করা এবং আঞ্চলিক সংস্থার সমর্থন চাওয়া প্রয়োজন হতে পারে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ন্যায়বিচার ও মানবিক নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি এখনও অস্থির, এবং উভয় রাজধানীই সম্পূর্ণ সম্পর্ক ভেঙে না ফেলার জন্য সংলাপের পথ খোঁজার চেষ্টা করছে। তবে গাজা যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান মামলার প্রভাব এবং কূটনৈতিক প্রোটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগ দু’দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।



