কিয়েভে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কি সাম্প্রতিক একটি গোপনীয় বৈঠকে রাশিয়া সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনের নতুন পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। তিনি জানিয়েছেন, ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর মূল উদ্দেশ্য হবে প্রতি মাসে অন্তত পঞ্চাশ হাজার রাশিয়া সরকারী সৈন্যকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বাদ দেওয়া। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ড্রোন প্রযুক্তি এবং আর্থিক পুরস্কার ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা দেওয়া হবে।
বৈঠকে উপস্থিত উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা জেলেনস্কির নির্দেশ অনুসরণে কৌশলগত পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখন থেকে সব ইউনিটের কাজ হবে শত্রুর মানবসম্পদকে ধারাবাহিকভাবে হ্রাস করা, যাতে রাশিয়া সরকারের নিয়োগ ক্ষমতা অতিক্রম করা যায়। লক্ষ্যটি রাশিয়ার মাসিক নতুন সৈন্য সংগ্রহের গতি ছাড়িয়ে যাওয়া, ফলে ক্রেমলিনের সামরিক পরিকল্পনা ব্যাহত হবে।
জেলেনস্কি এই পরিকল্পনাকে রাশিয়া সরকারের জনবল সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়ার মূল হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি যুক্তি দেন, যদি ইউক্রেন শত্রুর ক্ষয়ক্ষতি এমন স্তরে নিয়ে যায় যেখানে রাশিয়া সরকার নতুন সৈন্য নিয়োগে অক্ষম হয়, তবে যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে আলোচনার টেবিলেও ইউক্রেনের অবস্থান শক্তিশালী হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শত্রুর ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানোকে যুদ্ধের সাফল্যের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইউক্রেনীয় বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ২০২২ সালের যুদ্ধের সূচনা থেকে এখন পর্যন্ত রাশিয়া সরকারের প্রায় বারো লক্ষ সৈন্য আহত বা নিহত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক স্বতন্ত্র সংস্থা এখনও এই সংখ্যার সঠিকতা নিশ্চিত করতে পারেনি। জেলেনস্কি স্বীকার করেন, বর্তমান তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে, তবু তিনি ড্রোনের সর্বোচ্চ ব্যবহারকে এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের একমাত্র উপায় হিসেবে উল্লেখ করেন।
ড্রোনের ব্যবহার ইতিমধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় আশি শতাংশ লক্ষ্যবস্তুতে প্রভাব ফেলছে। এই প্রবণতা বাড়াতে ড্রোন বিশেষজ্ঞ মিখাইলো ফেদোরভকে নতুন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। ফেদোরভের দায়িত্বে ড্রোনের নকশা, উৎপাদন ও অপারেশনাল সমর্থনকে ত্বরান্বিত করা এবং শত্রুর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা অন্তর্ভুক্ত।
সেনাবাহিনীর মনোবল বাড়াতে এবং শত্রুকে সুনির্দিষ্টভাবে আঘাত করতে সরকার বিশেষ ‘পয়েন্ট সিস্টেম’ চালু করেছে। এই ব্যবস্থায় সফল আক্রমণের জন্য আর্থিক পুরস্কার প্রদান করা হয়, যা সৈন্যদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক চেতনা জাগিয়ে তুলতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে ড্রোনের গবেষণা ও উৎপাদনে তহবিল বাড়িয়ে রাশিয়া সরকারের সামরিক অগ্রগতি ধীর করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
রাশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে বেসামরিক এলাকায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে ধারাবাহিক হামলার ফলে কিয়েভসহ বড় শহরগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ শীতের তীব্রতায় বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। এই মানবিক সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং যুদ্ধের মানবিক দিকের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, আবুধাবিতে চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনায় এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা অর্জিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতা ও চাপের সত্ত্বেও পক্ষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। আলোচনার অগ্রগতি না হওয়ায় যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ এবং শর্তাবলী নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, জেলেনস্কির নতুন কৌশল রাশিয়া সরকারের সামরিক পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে, তবে একই সঙ্গে শত্রুর বেসামরিক আক্রমণ বাড়ার ফলে মানবিক সংকট আরও তীব্র হতে পারে। পরবর্তী সপ্তাহে কিয়েভের সরকার কিভাবে ড্রোন উৎপাদন বাড়াবে এবং আর্থিক পুরস্কার ব্যবস্থা সম্প্রসারিত করবে তা নজরে থাকবে, আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ রাশিয়া সরকারের মানবিক আক্রমণ বন্ধ করার দিকে বাড়বে।



