বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ মিলিয়ন মানুষ এমন সামাজিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, যাদের নাম ও সমস্যাগুলো প্রায়শই জাতীয় আলোচনার বাইরে থাকে। এ গোষ্ঠীর মধ্যে আদিবাসী, চা শ্রমিক, হারিজান (পরিস্কার‑পরিচ্ছন্নতা কর্মী), রিশি (মেরামতকারি), কাইপুরা (শূকর পালনকারী), বেডে (যাত্রিক), জালাদা (সমুদ্র‑মৎস্যজীবী), যৌনকর্মী, হিজড়া ও বিহারিরা অন্তর্ভুক্ত।
এই সম্প্রদায়গুলো ধর্ম, পেশা, জাতিগত পরিচয়, সংস্কৃতি, অভিবাসন ইতিহাস এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে ব্যাপক বৈষম্যের শিকার। তারা বেতনহীনতা, শত্রুতাপূর্ণ আচরণ, অপমানজনক পরিবেশ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মুখোমুখি হয়।
দারিদ্র্য সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ বহু-মাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে; উপরে উল্লেখিত গোষ্ঠীগুলোও এ সংখ্যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তাদের জীবনের মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা প্রায়শই অবহেলিত থাকে।
অনেক গোষ্ঠীকে “অস্পৃশ্য” বা “দালিত” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা তাদের সামাজিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করে। এই লেবেলগুলো কেবল সামাজিক বৈষম্যকে বাড়িয়ে দেয় না, বরং রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে তাদের স্বরকে নিঃশব্দ করে রাখে।
অস্থায়ী সরকার যখন ব্যাপক সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করে, তখন বিভিন্ন ক্ষেত্রের জন্য কমিশন গঠন করার কথা বলা হয়। তবে এই গোষ্ঠীগুলোর জন্য কোনো বিশেষ কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি।
ফলস্বরূপ, এই সম্প্রদায়গুলোকে লক্ষ্য করে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বা নীতি প্রণয়ন করা হয়নি, যদিও তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবিচারের শীর্ষে রয়েছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল যে, নতুন কমিশনগুলো তাদের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি চলায় রাজনৈতিক দলগুলো এখনও এই গোষ্ঠীগুলোর জন্য স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করেনি। ভোটের প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, তাদের সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার না দিয়ে প্রচারমূলক কৌশলেই মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।
দশকের বেশি সময় ধরে এই সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করা কর্মী ও গবেষকরা এখন স্পষ্টভাবে দাবি করছেন যে, যদি রাজনৈতিক দলগুলো সত্যিই সকল নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়, তবে তাদের নীতি কাঠামোতে এই গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অগ্রসর হওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো যদি এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি না করে, তবে সামাজিক অস্থিরতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দারিদ্র্যের চক্র অব্যাহত থাকবে। তাই আসন্ন নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ে, এই সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ আইন বা কমিশন গঠন না হলে, তাদের অবহেলা রাজনৈতিক দায়িত্বের গুরুতর ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হবে।
সংক্ষেপে, বাংলাদেশে অদৃশ্য ও অবহেলিত গোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও নীতি গঠনের প্রয়োজন তীব্রতর হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি সরকার ও দলগুলো এই গোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট কাঠামো গড়ে না তোলে, তবে তাদের সমস্যাই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের বাধা হয়ে দাঁড়াবে।



