বাংলাদেশের ইটের চুল্লি শিল্পে শ্রমিক নিয়োগের সর্দারী পদ্ধতি শ্রমিকদের উপর ব্যাপক শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে। এই পদ্ধতিতে চুল্লি মালিকরা সরাসরি নিয়োগ না করে মধ্যস্থতাকারী সর্দারদের মাধ্যমে শ্রমিককে কাজের চুক্তি দেয়। ফলে শ্রমিকের কাজের শর্ত, চলাচল ও শৃঙ্খলা সর্দারদের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে, যেখানে প্রায়শই হিংসা, হুমকি ও সীমাবদ্ধতা ব্যবহার করা হয়।
সর্দাররা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মৌসুমী শ্রমিককে সংগ্রহ করে, তাদেরকে চুল্লিতে পাঠায় এবং কাজের সময়সূচি নির্ধারণ করে। চুল্লি মালিকদের উৎপাদন লক্ষ্য পূরণের জন্য সর্দাররা শ্রমিকের দৈনিক কাজের ঘণ্টা, বিশ্রাম ও গমনাগমন নিয়ন্ত্রণ করে। এই ব্যবস্থা শ্রমিককে সরাসরি মালিকের দায়িত্ব থেকে দূরে রাখে, ফলে মালিকের আইনি দায়িত্ব কমে যায়।
শ্রমিকের আর্থিক দিকেও সর্দারী পদ্ধতি গভীর প্রভাব ফেলে। শস্যের মৌসুমের শেষে আয় কমে গেলে শ্রমিকরা প্রায়শই সর্দার বা মধ্যস্থতাকারীর কাছ থেকে ঋণ নেয়। ঋণের সুদ ও ফেরত শর্ত অতিরিক্ত বাড়িয়ে দেয়, ফলে শ্রমিকরা পুরো মৌসুমে চুল্লিতে কাজ না করলে ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়ে। এই ঋণ-ভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতি আন্তর্জাতিক শ্রম আইনে স্বীকৃত দাসত্বের সমতুল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইটের চুল্লি কাজ সাধারণত অশ্বিন মাসের পরে, অর্থাৎ অক্টোবরের কাছাকাছি শুরু হয় এবং ছয় মাসের কাছাকাছি সময় চলে। বর্তমানে মৌসুমের মাঝামাঝি, চুল্লি নির্মাণ ও ইট উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা মৌসুমের শেষের বৃষ্টির আগ পর্যন্ত চলবে বলে অনুমান। এই সময়কালে শ্রমিকের কাজের চাপ বৃদ্ধি পায়, কারণ উৎপাদন লক্ষ্য পূরণে সময়সীমা কম থাকে।
পরিবেশ বিভাগ অনুসারে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ৭,০৮৬টি ইটের চুল্লি কার্যকর রয়েছে, তবে বাস্তবে এই সংখ্যার দ্বিগুণের কাছাকাছি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। চুল্লিগুলোর অর্ধেকের বেশি পরিবেশগত অনুমোদন পায়নি, এবং প্রায় কোনো চুল্লি শ্রম আইন মেনে চলে না, বিশেষ করে কাজের ঘণ্টা ও বাধ্যতামূলক শ্রমের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে।
শ্রমিকদের কাজের সময়সীমা, বিশ্রাম ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধি অধিকাংশ চুল্লিতে প্রয়োগ হয় না। ফলে শ্রমিকরা দীর্ঘ সময় কাজ করে, যথাযথ বিশ্রাম পায় না এবং প্রায়শই অপ্রয়োজনীয় শারীরিক ঝুঁকির মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) অনুযায়ী, বাধ্যতামূলক শ্রমের কোনো রূপই আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ, এবং বাংলাদেশকে এই দিক থেকে আন্তর্জাতিক সমঝোতা রক্ষা করতে হবে।
বৈশ্বিক পর্যায়ে শ্রমিক অধিকার রক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা বাংলাদেশকে শ্রমিক শোষণ বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোও একই শিল্পে অনুরূপ সমস্যার সম্মুখীন হওয়ায়, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও নীতি সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। কূটনৈতিক চ্যানেলে শ্রমিক শোষণ মোকাবিলায় দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালু হয়েছে, যেখানে মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সমর্থন প্রদান করছে।
মানবাধিকার কর্মী পিজুয়াশ বাউলিয়া পিন্টু, যারা দেশের ডেল্টা অঞ্চলের সঙ্গে পরিচিত, উল্লেখ করেছেন যে সর্দারী পদ্ধতি এবং ঋণ দাসত্বের চক্র ভাঙা না হলে ইটের চুল্লি শিল্পের উন্নয়ন টেকসই হবে না। তিনি বলেন, সরকার ও শিল্পের উভয় পক্ষেরই স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, পরিবেশগত অনুমোদন ও শ্রমিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, যদি এই সমস্যাগুলো সমাধান না করা হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তি ও বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের টেকসই উন্নয়ন মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য না থাকলে রপ্তানি পণ্যগুলোর উপর শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই, সরকারকে দ্রুত নীতি সংস্কার, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ও শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষার জন্য আইন প্রয়োগে জোর দিতে হবে।
সারসংক্ষেপে, সর্দারী পদ্ধতি ও ঋণ দাসত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইটের চুল্লি শিল্পে শ্রমিক শোষণ অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে এটি বাধ্যতামূলক শ্রমের সমতুল্য, এবং পরিবেশগত ও শ্রমিক সুরক্ষা মানদণ্ডের লঙ্ঘন ব্যাপক। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই চক্র ভাঙা কঠিন, যা শিল্পের টেকসইতা ও দেশের আন্তর্জাতিক সুনাম রক্ষার জন্য অপরিহার্য।



