ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক আক্রমণ রোধের উদ্দেশ্যে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় গেছেন। সফরটি শুক্রবারের সকালেই শুরু হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারস্পরিক হুমকি বাড়ছে। তুর্কি কূটনীতিকরা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিছু ছাড় দিতে রাজি করাতে চাইছে, যাতে সংঘাতের ঝুঁকি কমে।
আঙ্কারায় আরাঘচির উপস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তীব্র উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে, কারণ একই সময়ে ইসরাইল ও সৌদি আরবের উচ্চপদস্থ প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও ওয়াশিংটনে ইরান বিষয়ক আলোচনার জন্য রয়েছেন। উভয় পক্ষের কূটনৈতিক কার্যক্রম একসাথে চলার ফলে পারস্পরিক বিশ্বাসের ফাঁক পূরণে চাপ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি ইরানের জন্য সব ধরনের চুক্তির পথ উন্মুক্ত রয়েছে বলে জোর দিয়েছেন। তিনি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানো উচিত নয়, এবং প্রেসিডেন্টের প্রত্যাশা অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত থাকবে, এ কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রাক্তন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ইরানের সময়সীমা দ্রুত শেষ হয়ে আসছে বলে সতর্কতা দিয়েছিলেন, এবং কোনো সামরিক আক্রমণ ঘটলে তা বিশাল ধ্বংসের কারণ হবে বলে উল্লেখ করেন। তবে একই রাতে ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টারে তিনি কিছুটা নমনীয় সুরে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বড় জাহাজগুলো ইরানের দিকে এগিয়ে চলেছে, তবে সেগুলো ব্যবহার না করা সর্বোত্তম হবে।
ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান, মেজর জেনারেল আমির হাতামি, গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের সামরিক কৌশলে পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইরান এক হাজারের বেশি জল ও স্থলভিত্তিক ড্রোন উৎপাদন করেছে, যা দেশের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে যে কোনো আক্রমণের প্রতিক্রিয়া দিতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, প্রায় ত্রিশ হাজার মার্কিন সৈন্য ইরানের স্বল্প পরিসরের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও একমুখী ড্রোনের নাগালের মধ্যে রয়েছে। এই সংখ্যা ইরানের সামরিক প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে জটিল করে তুলছে।
একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, তেহরান সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও উন্মুক্ত রাখছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, যদিও পারমাণবিক বিষয়ে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে।
ক্রীমলিনের পক্ষ থেকে উভয় পক্ষকে কূটনৈতিক সুযোগ ব্যবহার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। রাশিয়ার দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রে তুরস্কের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
তুর্কি কূটনীতিকরা ইতিমধ্যে ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রাম নিয়ে কিছু নমনীয়তা চাওয়ার পরিকল্পনা চালু করেছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি কমে যায়। তারা বিশ্বাস করে, তুরস্কের মধ্যস্থতা উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য সমাধান তৈরি করতে সহায়তা করবে।
ইসরাইল ও সৌদি আরবের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনে ইরান সংক্রান্ত আলোচনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তাদের উপস্থিতি ইরানের পারমাণবিক নীতি ও সামরিক কার্যক্রমের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে, দু’পক্ষের কূটনৈতিক সংলাপের গুরুত্ব বাড়ছে। উভয় দেশই সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে চায়, যদিও শর্তাবলিতে পার্থক্য রয়ে গেছে।
আঙ্কারায় আরাঘচির সফরটি তুরস্কের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তুরস্কের সরকার ইরানকে পারমাণবিক বিষয়ে কিছু ছাড় দিতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগও বিবেচনা করছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, যদি তুরস্কের মধ্যস্থতা সফল হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংলাপের সুযোগ বাড়বে, যা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে পারে। তবে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি অনিশ্চিতই রয়ে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই সময়ে সম্ভাব্য সংঘাতের বিস্তৃত প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা আশঙ্কা করে, যদি যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলবে। তাই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়িয়ে তুরস্কের মধ্যস্থতা সফল করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অগ্রাধিকার।
সারসংক্ষেপে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঙ্কারায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি রোধে আলোচনার জন্য গেছেন, তুরস্ককে মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, তুরস্ক, ক্রীমলিন ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলো কূটনৈতিক সমাধানের দিকে মনোনিবেশ করছে। ভবিষ্যতে এই সংলাপের ফলাফলই অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার দিক নির্ধারণ করবে।



