যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ শুক্রবার ইরান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনি এবং তার তত্ত্বাবধানে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত জানায়। এই পদক্ষেপের পেছনে ইরানে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা অভিযানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমন করতে ব্যবহৃত সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য অনুযায়ী হাজার হাজার নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে।
ট্রেজারি বিভাগের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মোমেনি নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রমে সরাসরি দায়ী এবং তার নেতৃত্বে গৃহীত কঠোর পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুসারে, নিরাপত্তা বাহিনী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমন করতে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে ব্যাপক রক্তপাত ঘটিয়েছে।
এই নিষেধাজ্ঞার সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপের হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করে দ্বিমুখী কূটনৈতিক পথের সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
ফাইন্যান্সিয়াল তালিকায় নতুন করে পাঁচজন ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাদের যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে সহিংস দমন-পীড়নে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের প্রমাণ রয়েছে। এই কর্মকর্তারা নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপদস্থ সদস্য, যারা প্রতিবাদ দমনে কৌশলগত ভূমিকা পালন করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানি বিনিয়োগকারী বাবাক জানজানি এবং যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত দুটি ডিজিটাল সম্পদ বিনিময় প্ল্যাটফর্মকেও লক্ষ্য করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি দাবি করে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত আর্থিক লেনদেন প্রক্রিয়াকরণে জড়িত ছিল।
ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই পদক্ষেপের পেছনের লক্ষ্যকে ইরানি ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর ডিজিটাল সম্পদ ব্যবহার করে সাইবার অপরাধ ও অর্থায়ন রোধে অব্যাহত অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান সরকার ও তার সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের আর্থিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
বেসেন্টের মন্তব্যে তিনি একটি রূপক ব্যবহার করে ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে “ডুবতে থাকা জাহাজের ইঁদুরের মতো” বর্ণনা করেন, যারা জনগণের কাছ থেকে লুট করা অর্থকে বিশ্বব্যাপী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাচার করতে চায়। তিনি আশ্বাস দেন, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বিভাগ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এই নিষেধাজ্ঞা ইরান সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়াবে এবং আইআরজিসি-কে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন কঠিন করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। তবে ইরান সরকার থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের ফলে ইরানের আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের ওপর অতিরিক্ত সীমাবদ্ধতা আরোপিত হতে পারে, বিশেষ করে ডিজিটাল মুদ্রা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে। ইরানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকল্প আর্থিক চ্যানেল খুঁজতে বাধ্য করা সম্ভব, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা বাড়াতে পারে, তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভবিষ্যতে আরও আর্থিক ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রয়েছে।
ট্রেজারি বিভাগ উল্লেখ করেছে, ইরানি গোষ্ঠী ও তাদের নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আর্থিক অভিযান অব্যাহত থাকবে, বিশেষ করে ডিজিটাল সম্পদ ব্যবহার করে সাইবার অপরাধে জড়িতদের লক্ষ্য করে। এই নীতি ইরানের আর্থিক অবকাঠামোকে দুর্বল করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ইরান সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতা বন্ধ করতে এবং আইআরজিসি-কে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে গৃহীত হয়েছে। এই পদক্ষেপের পরিণতি ইরানের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে।



