ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিসপুট রেজল্যুশন (ইকসিড) সম্প্রতি একটি রায় জারি করেছে, যেখানে কানাডার নাইকো রিসোর্সেসকে সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ২০০৫ সালে ঘটিত দু’টি বিস্ফোরণের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ৪২০ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ৫১২ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই রায়টি গ্যাসক্ষেত্রের মালিকানা হস্তান্তর, নিরাপত্তা লঙ্ঘন এবং পরিবেশগত ক্ষতির জন্য আন্তর্জাতিক সালিসি প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি ২০০৩ সালে নাইকো রিসোর্সেসকে অনুসন্ধানের অধিকার প্রদান করা হয়। তবে ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন ২০০৫ তারিখে দুইটি মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটায়, যার ফলে গ্যাসের মজুদ সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায় এবং আশেপাশের অবকাঠামো ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এই ঘটনার ফলে গ্যাস উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে।
বিপর্যয়ের পর, পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ সরকার একত্রে নাইকো রিসোর্সেসের বিরুদ্ধে ১০১ কোটি ৪০ লাখ ডলার (প্রায় ১২,৩৭১ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ দাবি করে। নাইকো এই দাবিকে অস্বীকার করে এবং ২০০৭ সালে বাংলাদেশ আদালতে মামলা দায়ের করে। এরপর মামলা হাইকোর্টে পৌঁছায়, যেখানে নাইকোর বাংলাদেশে থাকা সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং চুক্তি বাতিলের আদেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টেও পেট্রোবাংলার পক্ষে রায় প্রদান করা হয়।
বছরের পর বছর চলমান আইনি লড়াইয়ের পর, আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় এবং ইকসিড রায়ে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ৪২০ মিলিয়ন ডলার নির্ধারিত হয়। যদিও রায়ের পূর্ণ টেক্সট এখনো প্রকাশিত হয়নি, তবে আইনজীবীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত সংক্ষিপ্তসার থেকে এই সংখ্যা নিশ্চিত হয়েছে। রায়ের বিশদ প্রকাশের পর বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের জন্য পরামর্শ গ্রহণ করবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত করেছেন যে, রায়ে নির্ধারিত ৫১২ কোটি টাকা মূল দাবির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম এবং প্রকৃত ক্ষতি, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং আইনি ব্যয়ের চাহিদা পূরণে অপর্যাপ্ত। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও রায়টি একটি ইতিবাচক সিগন্যাল দেয়, তবু বাংলাদেশ সরকারকে অতিরিক্ত আর্থিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা গেলে, ৫১২ কোটি টাকার নগদ প্রবাহ বাংলাদেশ সরকারের বাজেটের উপর স্বল্পমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, বিশেষত জ্বালানি খাতে পুনর্গঠন ও ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের পুনর্বাসনে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাস, পরিবেশগত ক্ষতি এবং আইনি খরচের তুলনায় যথেষ্ট নয়, ফলে সেক্টরের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য অতিরিক্ত তহবিল সংগ্রহ বা আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে, নাইকো রিসোর্সেসের আর্থিক দায়বদ্ধতা ও সুনামেও প্রভাব পড়বে, যা ভবিষ্যতে কোম্পানির বাংলাদেশে নতুন প্রকল্পের অনুমোদন ও বিনিয়োগের শর্তাবলীতে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই রায়টি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্বিমুখী বার্তা বহন করে। একদিকে, ইকসিডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সালিসি প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে, যা বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে। অন্যদিকে, রায়ে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ মূল দাবির তুলনায় কম হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা চুক্তি শর্তাবলী, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বীমা কাভারেজের গুরুত্ব পুনর্বিবেচনা করতে পারে। ফলে, ভবিষ্যতে গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান প্রকল্পে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও চুক্তি নথির কঠোরতা বাড়বে বলে আশা করা যায়।
বাংলাদেশ সরকার রায়ের পূর্ণাঙ্গ নথি পাওয়ার পর তা বিশ্লেষণ করে যথাযথ কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে রায়ের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন, অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ চাওয়ার জন্য পুনরায় আলোচনার উদ্যোগ অথবা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের জন্য তহবিলের সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ। একই সঙ্গে, সরকার গ্যাসক্ষেত্রের নিরাপত্তা মানদণ্ড শক্তিশালী করার জন্য নতুন নীতি প্রণয়ন এবং ভবিষ্যৎ অনুসন্ধান প্রকল্পে পরিবেশগত মূল্যায়নকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা চালু করেছে। এই পদক্ষেপগুলো গ্যাস শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।



