ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কার প্রচেষ্টার মূল্যায়ন করে একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনের শিরোনাম “২০২৪-এর অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতির রূপান্তর” এবং এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সংস্কার উদ্যোগের মুখোমুখি হয়ে গভীর রাষ্ট্র ও আমলাতন্ত্রের প্রতিরোধের ফলে সরকার পেছিয়ে গেছে। বিশেষ করে আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনের পরে, আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে সংস্কার প্রক্রিয়া থামিয়ে দিতে পারে, এটাই প্রতিবেদনের প্রধান সতর্কতা।
বিআইজিডি পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রায় অর্ধেকের বেশি (৫১ শতাংশ) মানুষ মনে করেন, সংসদ নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা জরুরি। এই মতামত নির্বাচনী সময়ে সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতি, সামাজিক কল্যাণ ও রাজনৈতিক কাঠামোতে বেশ কয়েকটি সংস্কার নীতি চালু করার চেষ্টা করেছে। তবে এসব নীতির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় উচ্চ পর্যায়ের আমলাতন্ত্রের প্রতিরোধ ও ‘ডিপ স্টেট’ের হস্তক্ষেপের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে, সরকার তার ঘোষিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
মির্জা হাসান, উপদেষ্টা, বিআইজিডি বলেন, “শেষ পর্যন্ত যে যেদিক দিয়ে চাপ দিয়েছে, তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) সেদিকে চলে গেছেন। তিনি ঘোষণা দিচ্ছেন এটা করব, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল সেটা করলেন না।”
প্রতিবেদন অনুসারে, সরকার বিএনপির বিরোধিতা সামলাতে সক্ষম হলেও, আমলাতন্ত্রের শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে সংস্কার উদ্যোগে পিছু হটে গেছে। এই বাস্তবতা থেকে অনুমান করা যায়, নির্বাচনের পর আমলাতন্ত্র সংস্কারবিরোধী ভূমিকা নিতে পারে এবং গণতান্ত্রিক শাসনপ্রক্রিয়ার রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বিআইজিডি উল্লেখ করেছে যে, সংস্কারের প্রস্তাব বাস্তবায়নের সময়কাল নির্বাচন পরেই নির্ধারিত হয়েছে। এই সময়সূচি পরবর্তী সংসদ ও রাস্তায় দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সম্ভাব্য উৎস হয়ে দাঁড়াবে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
প্রতিবেদনটি ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক অবস্থান পরিবর্তনের একটি চিত্রও উপস্থাপন করেছে। এতে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে “আওয়ামী লীগ” সেন্টার-লেফট (মধ্যবাম) অবস্থানে ছিল, তবে ২০২৪ সালে তার অবস্থান সেন্টার-রাইট বা মধ্যডানে পরিবর্তিত হয়েছে। অন্যদিকে, “বিএনপি” ১৯৯১ থেকে তার মধ্যডান বা সেন্টার-রাইট অবস্থান বজায় রেখেছে। নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি (NCP)কে মধ্যপন্থী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
এই আদর্শিক পরিবর্তনগুলো দেশের রাজনৈতিক গতিপথে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। “আওয়ামী লীগ”ের কেন্দ্র-ডান দিকে সরে যাওয়া এবং “বিএনপি”র স্থিতিশীল অবস্থান, পাশাপাশি নতুন দলগুলোর উদ্ভব, দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে নতুন গতিশীলতা সৃষ্টি করেছে।
বিআইজিডি প্রতিবেদনের সমাপনী অংশে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি আমলাতন্ত্রের প্রভাব সীমাবদ্ধ না করা যায়, তবে সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হবে এবং শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা হ্রাস পাবে। তাই, নির্বাচনের পরের সময়ে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণ করা সংস্কার সফলতার জন্য অপরিহার্য বলে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।



