চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) কে কোনো দরপত্র ছাড়াই একটি বিদেশি সংস্থার কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্তে শ্রমিক ও কর্মচারীরা বিরোধ প্রকাশ করেছে। এই বিরোধের প্রেক্ষিতে তারা শনিবার ও রবিবার প্রত্যেক দিন আট ঘণ্টা কাজ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
শ্রমিক গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে টার্মিনালকে বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চালিয়ে আসছে। পূর্বে সরকারী সিদ্ধান্তের বিরোধে বন্দর এলাকায় সমাবেশ, মিছিল এবং মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখনো পর্যন্ত কোনো সরকারি ব্যাখ্যা বা বিকল্প পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ পর্যায়ে এনসিটি টার্মিনালের চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা যায়। এই প্রক্রিয়ার বিরোধে শ্রমিকরা সরকারকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
শ্রমিক ও কর্মচারী সংগঠন স্কপ চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দল এবং চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দল একত্রে ধর্মঘটের পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে। উক্ত সংগঠনগুলোর নেতারা শনিবার ও রবিবারের কর্মবিরতি অব্যাহত রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের জেনারেল সেক্রেটারি ও স্কপ নেতা নুরুল্লা বাহার ইত্তফাক উল্লেখ করেছেন, দুই দিনের ধর্মঘটের সময়সূচি পূর্বনির্ধারিতভাবে চালু থাকবে এবং কোনো পরিবর্তন হবে না। একই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দলের সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন খোকনও সরকার থেকে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে, বন্দর কর্তৃপক্ষের নোটিশ ও প্রজ্ঞাপন ঘন ঘন জারি হওয়ায় আলোচনার পরিবেশ অনুপযুক্ত বলে মন্তব্য করেছেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়ায় সেনা, বাংলাদেশ গার্ড এবং পুলিশকে স্থানে স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে ঘন্টার পর ঘন্টা নোটিশ ও আদেশ জারি করা হচ্ছে, যা শ্রমিকদের সংগঠিত আলোচনার সুযোগকে সীমিত করেছে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা গেলে, এনসিটি টার্মিনাল দেশের প্রধান কন্টেইনার লোডিং-আনলোডিং হাবের একটি। হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় যদি শ্রমিক বিরোধ দীর্ঘায়িত হয়, তবে বন্দর কার্যক্রমে বিলম্ব এবং শিপিং খরচে বৃদ্ধি হতে পারে। আন্তর্জাতিক কন্টেইনার লাইনগুলো সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য হতে পারে, যা রপ্তানি-আমদানি ব্যবসায়িক চক্রে প্রভাব ফেলবে।
এছাড়া, বিদেশি কোম্পানির হাতে টার্মিনালের পরিচালনা হস্তান্তর হলে, টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা ও সেবা মানে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় শ্রমিকদের উদ্বেগের মূল কারণ হল চাকরির নিরাপত্তা, বেতন কাঠামো এবং কাজের শর্তের সম্ভাব্য পরিবর্তন। এসব অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীর আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি সরকার হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না করে এবং শ্রমিক বিরোধ অব্যাহত থাকে, তবে বন্দর কার্যক্রমে ধারাবাহিক ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রপ্তানি করা পণ্যের গ্লোবাল সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, সরকার যদি সমঝোতা ভিত্তিক সমাধান খুঁজে বের করে, তবে টার্মিনালের আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিদেশি বিনিয়োগের সুবিধা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। তবে তা বাস্তবায়নের জন্য শ্রমিকদের সঙ্গে স্বচ্ছ আলোচনা এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা অপরিহার্য।
সংক্ষেপে, এনসিটি টার্মিনালের হস্তান্তর প্রক্রিয়া বর্তমান শ্রমিক বিরোধের কারণে বন্দর কার্যক্রমে অস্থায়ী বাধা সৃষ্টি করেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি এবং সরকারি নোটিশের ধারাবাহিকতা পরিস্থিতি তীব্র করেছে। বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই বিরোধের দীর্ঘায়িত হওয়া শিপিং খরচ বৃদ্ধি, সময়সীমা হ্রাস এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে। সরকার ও শ্রমিক উভয়েরই স্বার্থ সংরক্ষণে সমন্বিত সমাধান খোঁজা জরুরি, যাতে বন্দর কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।



