সান্ড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্ব সিনেমা বিভাগে প্রদর্শিত ‘শোক ও অর্থ’ চলচ্চিত্রটি কোসোভোর দৃষ্টিকোণ থেকে বৈশ্বিক অর্থনীতির টানাপোড়েন তুলে ধরেছে। ভিসার মরিনার তৃতীয় দিকনির্দেশনা, পূর্বের ‘বাবাই’ ও ‘এক্সিল’ এর পর এই কাজটি তার সূক্ষ্ম বর্ণনাশক্তি আরও গভীর করেছে।
চিকাটোভে এ ভেজেটার গ্রামটি প্রিস্তিনার থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, তবে ছবিতে দেখানো দুই স্থানই চরিত্রদের জন্য পৃথিবীর বিপরীত প্রান্তের মতো অনুভূত হয়। গ্রাম্য পরিবেশের শান্ত রিদম ও নগরের দ্রুত গতি এখানে তীব্রভাবে তুলনা করা হয়েছে।
শাবান এবং হাটিকশে নামের দুজন পরিশ্রমী দুগ্ধ কৃষক, তিনটি কন্যা লালন-পালন করে, তাদের দৈনন্দিন জীবনে নির্ভরযোগ্য রুটিন ও সীমিত আয় রয়েছে। গরু পালনের কাজ, দুধ বিক্রি এবং পরিবারের ছোটখাটো চাহিদা তাদের জীবনের মূল স্তম্ভ।
একটি বিশ্বাসঘাতকতার ফলে পরিবারটি তাদের বাড়ি ও জীবনের ধারাবাহিকতা হারিয়ে প্রিস্তিনার নগরে স্থানান্তরিত হয়। এই অপ্রত্যাশিত স্থানচ্যুতি তাদেরকে নগর জীবনের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি করে, যেখানে তারা আরামদায়ক জীবনের স্বপ্নে আটকে থাকে না।
শহরে বসবাসের সময় শাবান ও হাটিকশে আর্থিক সংকটে পড়ে, ফলে তাদেরকে ধনী আত্মীয়দের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই দ্বিমুখী সহায়তা তাদের জন্য আশীর্বাদ ও অভিশাপ উভয়ই হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তা তাদের স্বাধীনতা ও গর্বকে ক্ষুণ্ন করে।
পরিবারের প্রধান নারীর ভূমিকা পালন করেন নানা, যাকে কুমরিজে হোক্সা অভিনয় করেছেন। তিনি খাবারের টেবিলের মাথায় বসে আর্থিক সিদ্ধান্ত নেন, পাশাপাশি পরিবারের মধ্যে মতবিরোধ মেটাতে মধ্যস্থতা করেন। তার উপস্থিতি পরিবারকে এক ধরনের স্থিতিশীলতা প্রদান করে।
চিত্রে শাবানের চরিত্রে অস্ট্রিট কাবাশি, হাটিকশের ভূমিকায় ফ্লোনজা কোডেলি, এবং নানার ভূমিকায় কুমরিজে হোক্সা অভিনয় করেছেন। অতিরিক্তভাবে আব্দিনাসার বেকা, ফিওনা গ্লাভিকা, আলবান উকাজ ও ত্রিস্টান হালিলাজের পারফরম্যান্সও ছবিতে অন্তর্ভুক্ত।
‘শোক ও অর্থ’ মোট দুই ঘণ্টা দশ মিনিটের দৈর্ঘ্যের এবং স্যান্ড্যান্সের বিশ্ব সিনেমা নাট্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে। এই বিভাগটি আন্তর্জাতিক স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রের জন্য নির্ধারিত, যেখানে গল্পের গুণমান ও দৃষ্টিভঙ্গি মূল মানদণ্ড।
মরিনার পূর্বের কাজগুলোতে দেখা যায় ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা উত্তেজনা, এবং এই চলচ্চিত্রেও তা স্পষ্ট। তিনি গ্রাম্য জীবনের সূক্ষ্মতা ও নগর জীবনের কঠোরতা একসঙ্গে মিশিয়ে একটি তীব্র বর্ণনা গড়ে তুলেছেন, যা দর্শকের হৃদয়কে স্পর্শ করে।
চিত্রের মূল থিম হল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব কীভাবে এক সাধারণ কৃষকের জীবনে প্রবেশ করে। শাবান ও হাটিকশের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে গ্লোবাল আর্থিক নীতির মানবিক দিকটি প্রকাশ করা হয়েছে, যা দর্শকদেরকে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যার সংযোগ বুঝতে সাহায্য করে।
অভিনয়গুলো সূক্ষ্ম ও স্বাভাবিক, অতিরিক্ত নাটকীয়তা ছাড়া চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে। কাবাশি ও কোডেলির পারফরম্যান্সে স্বাভাবিকতা ও সংযমের মিশ্রণ দেখা যায়, যা ছবির সামগ্রিক টোনকে আরও বাস্তবিক করে তুলেছে।
সমালোচকরা ছবিটিকে ধীর গতি সত্ত্বেও মনোমুগ্ধকর বলে প্রশংসা করেছেন, যেখানে প্রত্যেক দৃশ্যের মধ্যে টানাপোড়েন ও আশার ক্ষীণ আলো দেখা যায়। চলচ্চিত্রের দৃশ্যমান গুণমান ও সাউন্ড ডিজাইনও উচ্চ প্রশংসা পেয়েছে, যা গল্পের পরিবেশকে সমৃদ্ধ করেছে।
‘শোক ও অর্থ’ কোসোভোর গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা ও আধুনিক নগর সমাজের চ্যালেঞ্জকে একত্রে উপস্থাপন করে, যা আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্য নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করে। স্যান্ড্যান্সে প্রদর্শিত হওয়ায় এটি বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্রপ্রেমীদের নজরে আসবে, এবং কোসোভোর সামাজিক কাঠামোর গভীর বিশ্লেষণ হিসেবে বিবেচিত হবে।



