ক্যালিফোর্নিয়ার SLAC ন্যাশনাল অ্যাক্সিলারেটর ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানীরা এক্স‑রে ব্যবহার করে প্রায় এক হাজার পাঁচশো বছর পুরনো গ্রীক জ্যোতির্বিদ হিপার্কাসের তারার তালিকা প্রকাশ করেছেন। এই তালিকাটি ১৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তৈরি হয়েছিল এবং ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে একটি কপিতে সংরক্ষিত ছিল। লুকানো মানচিত্রটি এখন প্রথমবারের মতো মানব চোখে দৃশ্যমান হয়েছে।
ল্যাবের দুটি গবেষক ধাতব পাইপ ও কেবলের জটিল পরিবেশে কম্পিউটার স্ক্রিনে উজ্জ্বল কমলা রেখা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ওই রেখাগুলি প্রাচীন গ্রীক ভাষায় রচিত একটি কবিতার অংশ, যার মধ্যে আকাশীয় ঘটনাবলী ও তারার অবস্থান বর্ণনা করা হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, কবিতার শেষে তারার সমন্বয় ও ছোট মানচিত্রের সংযোজন রয়েছে।
হিপার্কাসের এই তালিকা মূলত নিকায়া শহরে প্রায় ১৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রচিত হয়েছিল এবং পরে ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে কোনো না কোনোভাবে কপি করা হয়। কপি করা অংশটি পশুর চামড়ায় লিখিত ছিল, তবে সময়ের সাথে সঙ্গে মূল লেখা মুছে নতুন পাঠ দিয়ে পুনরায় লিখে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় মূল টেক্সট লুকিয়ে যায়, ফলে শতাব্দী পরেও তা অদৃশ্য রয়ে যায়।
SLAC‑এর পার্টিকল ত্বরক থেকে উৎপন্ন শক্তিশালী এক্স‑রে রশ্মি ব্যবহার করে গবেষকরা চামড়ার স্তরে প্রবেশ করে লুকানো অক্ষরগুলোকে পুনরায় প্রকাশ করতে সক্ষম হন। এক্স‑রে রশ্মি চামড়ার ভেতরের ভিন্ন ঘনত্বের অংশগুলোকে আলাদা করে, ফলে পূর্বে অদৃশ্য থাকা কবিতা ও তার মানচিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই প্রযুক্তি প্রাচীন প্যালিম্পসেস্টের গোপন বিষয় উন্মোচনে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
প্রাচীন গ্রীসের সরাসরি নথিপত্র খুব কমই বেঁচে থাকে, কারণ অধিকাংশ লেখনী পাপাইরাসে করা হতো, যা সময়ের সাথে ভেঙে যায়। হিপার্কাসের মূল রচনাগুলোর বেশিরভাগই আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি, তবে ঐতিহাসিক সূত্রগুলো নির্দেশ করে যে তিনি প্রথম তারার তালিকা তৈরি করা এবং ত্রিকোণমিতির ভিত্তি স্থাপনকারী among the earliest scholars. এই নতুন প্যালিম্পসেস্টটি তার কাজের সরাসরি প্রমাণ সরবরাহ করে, যা ২০০০ বছরেরও বেশি পুরনো বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে পুনরায় মূল্যায়ন করতে সাহায্য করবে।
উদ্ঘাটিত পাণ্ডুলিপিটি প্রায় ১৮ সেমি বাই ২১ সেমি মাপের, একটি ছোট পেপারব্যাকের সমান আকারের। এটি একটি প্যালিম্পসেস্ট, অর্থাৎ মূল লেখনী মুছে নতুন লেখনী দিয়ে পুনরায় লিখিত চামড়া। বিশেষভাবে, এই পাণ্ডুলিপিটি কোডেক্স ক্লিমাকি রেসক্রিপটাস নামে পরিচিত এবং সেন্ট ক্যাথারিনের মঠে, ইজিপ্টের সিনাই মরুভূমিতে সংরক্ষিত ছিল। নবম বা দশম শতাব্দীর সময়ে একজন সন্ন্যাসী এই খালি প্যালিম্পসেস্টে ধর্মীয় গ্রন্থ রচনা করেন।
হিপার্কাসের কাজকে প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যায় একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি প্রথমে নক্ষত্রের অবস্থান নির্ভুলভাবে মাপা এবং ত্রিকোণমিতিক পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে তারার নকশা তৈরি করেন। তার তালিকায় প্রায় ১,০০০টি নক্ষত্রের সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা পরবর্তী জ্যোতির্বিদদের জন্য ভিত্তি সরবরাহ করেছিল। এই নতুন প্যালিম্পসেস্টের মাধ্যমে হিপার্কাসের মূল ডেটা সরাসরি দেখা সম্ভব হয়েছে, যা তার অবদানের প্রকৃত পরিধি নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিজ্ঞানী দল এখন এই লুকানো মানচিত্রের বিশদ বিশ্লেষণ শুরু করেছে। এক্স‑রে দিয়ে প্রাপ্ত চিত্রগুলোকে ডিজিটালভাবে পুনর্গঠন করে নক্ষত্রের সমন্বয় ও গঠন পুনরায় নির্ধারণ করা হবে। এই তথ্য ভবিষ্যতে জ্যোতির্বিদ্যা ও ইতিহাসের সংযোগ স্থাপন করে প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যার বিকাশের পথচিত্র পরিষ্কার করতে সহায়তা করবে। এছাড়া, প্যালিম্পসেস্টের অন্যান্য লুকানো অংশও এক্স‑রে প্রযুক্তি দিয়ে অনুসন্ধান করা সম্ভব হতে পারে।
প্রাচীন জ্ঞানকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার এই প্রচেষ্টা বিজ্ঞান ও মানব ইতিহাসের সংযোগকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে। পাঠক হিসেবে আমরা কি এই ধরনের আবিষ্কার থেকে আমাদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ করতে পারি, নাকি অতীতের গোপনীয়তা আমাদের জন্য নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করবে? ভবিষ্যতে আরও কোন লুকানো রেকর্ড আমাদের সামনে প্রকাশ পাবে, তা সময়ই বলবে।



