দীপু সানা, বাংলাদেশ ব্যাংক সদরঘাট শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক, এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী কুমার বিশ্বাসের একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি, ঢাকা শহরের সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের উপরে থেকে কংক্রিটের ব্লক পড়ে তার মাথায় আঘাত হানায় তিনি প্রাণ হারান। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সহকর্মীরা তৎক্ষণাৎ জরুরি সেবা ডেকেছিলেন, তবে চিকিৎসা সত্ত্বেও প্রাণ হারান।
দীপুর মৃত্যুর পরপরই, তার স্বামী কুমার বিশ্বাস রমনা মডেল থানায় মামলাটি দাখিল করেন এবং ঘটনাটিকে ‘হত্যা’ হিসেবে রেজিস্টার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন থানা পুলিশ, তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তদন্তের দায়িত্ব ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) পুলিশকে হস্তান্তর করা হয়। ডিবি পুলিশকে মামলার জটিলতা ও প্রমাণের ঘাটতি উল্লেখ করে অতিরিক্ত তদন্তের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করে, তবে মামলার শিকারের পরিবার প্রতিবেদনটির কিছু অংশে আপত্তি জানায়। আপত্তি উত্থাপনের পর, ডিবি বিভাগের একজন পরিদর্শককে পুনঃতদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং নতুন তদন্ত দল গঠন করা হয়। আদালত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ হিসেবে গত বছরের ৩০ এপ্রিল নির্ধারণ করে।
ডিবি পুলিশ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে ব্যর্থ হয়, ফলে বিচারক ৫ মার্চের পরবর্তী দিন পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দেন। এই বিলম্বের পরেও ডিবি পুলিশ কোনো চূড়ান্ত রিপোর্ট উপস্থাপন করতে পারেনি, যা কুমার বিশ্বাসের অসন্তোষ বাড়িয়ে দেয়। তিনি প্রকাশ্যে জানান, “পুলিশ বলছে হত্যার কোনো ক্লু পায়নি, তাই ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে। প্রকৃত ঘটনা কী, আমরা জানতে চাই।”
কুমার বিশ্বাসের মতে, তদন্তে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কর্মকর্তা আসা-যাওয়া করছেন, ফলে তদন্তের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, “যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এই ঘটনা ঘটিয়ে থাকে, তবে তাকে আইনের আওতায় আনা উচিত। নির্দোষ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়।” তার এই বক্তব্যে দেশের সাম্প্রতিক অন্যান্য দুর্ঘটনা, যেমন গুলশানে রডের আঘাতে মৃত্যু এবং মেট্রোরেল নির্মাণের নিচে ঘটিত মৃত্যু, উল্লেখ করা হয়েছে।
দীপু সানার মৃত্যুর সময় তার সন্তান কুমার বিশ্বাসের তিন বছর বয়সের ছিল; এখন শিশুটি পাঁচ বছর বয়সী। শিশুর ভাষা বিকাশে বিলম্ব এবং মাইনর অটিজমের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যার জন্য পরিবার চিকিৎসা ও থেরাপি চালিয়ে যাচ্ছে। মা-দাদীর অনুপস্থিতি শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে প্রভাব ফেলছে, যা পরিবারকে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
গত বছর ৩০ এপ্রিল ডিবি পুলিশ শেষবারের মতো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে, তবে তা অপর্যাপ্ত বলে আদালত পুনঃতদন্তের আদেশ দেয়। পুনঃতদন্তে ডিবি বিভাগের একজন পরিদর্শককে প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয় এবং নতুন সাক্ষী ও প্রমাণ সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হয়। আদালত এছাড়াও ডিবি পুলিশকে অতিরিক্ত তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও manpower প্রদান করতে নির্দেশ দেয়।
সাম্প্রতিক আদালতের আদেশ অনুযায়ী, ডিবি পুলিশকে মামলার সব দিক পুনরায় বিশ্লেষণ করে, সন্দেহভাজন ও সাক্ষীর তালিকা আপডেট করতে হবে। নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের পর, তদন্ত দলকে ঘটনাস্থল পুনরায় পরিদর্শন, নির্মাণস্থলের নিরাপত্তা নথি সংগ্রহ এবং কংক্রিট ব্লকের উৎপত্তি নির্ণয়ের কাজ অর্পণ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রমাণের বৈধতা ও সাক্ষ্যবৈধতা নিশ্চিত করার জন্য ফরেনসিক বিশ্লেষণও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মামলার বর্তমান অবস্থা অনুসারে, ডিবি পুলিশ এখনও চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রস্তুত করার পথে রয়েছে এবং আদালত নির্ধারিত তারিখে তা জমা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। কুমার বিশ্বাস ও তার পরিবার বিচারিক প্রক্রিয়ার দ্রুত সমাপ্তি এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার প্রত্যাশা করছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদন্তের স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় রেখে, শিকারের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও সমর্থন প্রদান করার আহ্বান জানানো হয়েছে।



