জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধের মাঝখানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের সময় সামরিক বিমান হামলার ফলে অন্তত ১৭০ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এই হামলা ডিসেম্বর ২০২২ থেকে জানুয়ারি ২০২৩ের মাঝামাঝি পর্যন্ত চারশো একাধিকবার সংঘটিত হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার টিমের প্রধান জেমস রোডেহ্যাভার নিশ্চিত করেছেন যে, প্রায় ৪০৮টি পৃথক বিমান হামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এই সংখ্যা স্বাধীন সূত্রের সমন্বয়ে যাচাই করা হয়েছে এবং নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকে ভোটগ্রহণের তিনটি ধাপ সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সময়কালে ঘটেছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই হামলাগুলি প্রধানত জনবসতিপূর্ণ এলাকায় লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যার ফলে ব্যাপক সিভিল ক্ষতি হয়েছে।
রোডেহ্যাভার আরও জানান যে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা সম্ভবত আরও বেশি হতে পারে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, তথ্য সংগ্রহে ভয় এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক পরিবার এখনও ক্ষতিগ্রস্তদের সঠিক সংখ্যা জানার জন্য অপেক্ষা করছে, এবং ভবিষ্যতে আরও তথ্য প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্কের একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের জনগণের উপর গভীর হতাশা নেমে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেন, সামরিক শাসন কর্তৃক আয়োজিত এই নির্বাচন জনগণের জন্য অতিরিক্ত কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ভোটদান প্রক্রিয়াটিও ভয়ের কারণে সীমিত হয়েছে। তুর্কের মতে, এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি বিরোধপূর্ণ।
নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, সামরিক সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার জাতিসমূহের সংঘ (ASEAN) এখনো এই নির্বাচনের বৈধতা স্বীকার করেনি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার দাবি করছে। এই অস্বীকৃতি মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
২০২১ সালের কূটনৈতিক ও সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার ধারাবাহিক অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। বেসামরিক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি করে দেশজুড়ে গণতন্ত্রপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপের শিকার হয়েছে। সংঘাতের ফলে প্রায় ৩.৬ লক্ষেরও বেশি মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছে, যা মানবিক সংকটের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, জাতিসংঘের এই তথ্য প্রকাশের পর থেকে বেশ কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা মিয়ানমারের সামরিক শাসনের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার জাতিসমূহের সংঘের অস্বীকৃতি এবং মানবাধিকার সংস্থার সতর্কতা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানবিক সাহায্যের শর্তাবলীর দিকে নিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে, মিয়ানমার সরকারকে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটাতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনুমোদন চাওয়া হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, নির্বাচনের সময়ে সামরিক বিমান হামলার ফলে সৃষ্ট মানবিক ক্ষতি মিয়ানমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। জাতিসংঘের তথ্য ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে, যা শেষ পর্যন্ত শান্তি প্রক্রিয়া এবং গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের দিকে অগ্রসর হতে পারে।



