ইসরাইলের গাজা-ইসরাইল সমন্বয়ক সংস্থা কোগাট শুক্রবার একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানায় যে, রাবিবার থেকে রাফা সীমান্ত পুনরায় চালু করা হবে। এই সিদ্ধান্ত গাজা উপত্যকার ২০ লক্ষেরও বেশি বাসিন্দার জন্য মিশরের সঙ্গে সরাসরি চলাচলের সুযোগ ফিরিয়ে দেবে। সীমান্তের পুনরায় খোলার শর্ত ও প্রভাব নিয়ে ইসরাইলের অফিসিয়াল মন্তব্যের বিশদ এখানে উপস্থাপন করা হল।
কোগাটের প্রকাশ্য ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, মিশর থেকে গাজায় ফিরে আসা নাগরিকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে, তবে এটি শুধুমাত্র তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে যারা যুদ্ধের সময় গাজা ত্যাগ করে এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা অনুমোদন পেয়েছে। এই শর্ত পূরণকারী ব্যক্তিরা নিরাপত্তা চেকপয়েন্ট পার করে রাফা ক্রসিং ব্যবহার করতে পারবে। কোগাটের বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কতজনকে এই সুযোগ দেওয়া হবে তা এখনও নির্ধারিত হয়নি।
রাফা সীমান্ত গাজার জন্য একমাত্র আন্তর্জাতিক সংযোগের পথ, যেখানে মানবিক সাহায্য, বাণিজ্যিক পণ্য এবং ব্যক্তিগত যাতায়াতের প্রধান প্রবাহ ঘটে। গাজা উপত্যকার জনসংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষের কাছাকাছি, এবং এই সীমান্তের বন্ধ থাকা তাদের বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযোগকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাধাগ্রস্ত করেছিল। পুনরায় খোলার ফলে এই জনসংখ্যা পুনরায় পরিবার, চিকিৎসা সেবা এবং মৌলিক সামগ্রীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
ইসরাইলের সেনাবাহিনী মে ২০২৪-এ রাফা সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর থেকে গাজার বেসামরিক চলাচল ও মানবিক সহায়তার প্রবাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় থেকে গাজা উপত্যকার মানুষ সীমিত উপায়ে সীমান্ত পার হতে পারছিল, যা মানবিক সংকটকে তীব্রতর করে তুলেছিল। সীমান্তের এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধ গাজার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পার প্রথম ধাপ হিসেবে রাফা সীমান্তের খোলার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। অক্টোবর ২০২৩-এ স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির ধারাবাহিকতা হিসেবে ইসরাইল এই পদক্ষেপটি গ্রহণ করেছে। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সীমান্তের মুক্তি গাজার মানবিক অবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনে সহায়তা করবে বলে আশা করা হয়।
ইসরাইল পূর্বে শর্ত রাখে যে, গাজায় আটক থাকা সব শেষ ইসরাইলি জিম্মির দেহ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত সীমান্ত খোলা হবে না। চলতি সপ্তাহে এই দেহগুলো উদ্ধার হওয়ার পর, ইসরাইলের এই শর্ত পূরণ হয়েছে এবং তাই রাফা সীমান্তের পুনরায় খোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা গাজার বাসিন্দা ও আন্তর্জাতিক সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে, রাফা সীমান্তের পুনরায় খোলার ফলে গাজার মানবিক পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তি পাবে। সীমান্তের মাধ্যমে সরবরাহিত খাবার, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি সামগ্রী দ্রুত গাজার দরজায় পৌঁছাবে। তাছাড়া, গাজার বাসিন্দারা পরিবারিক পুনর্মিলন ও চিকিৎসা সেবার জন্য মিশরে প্রবেশের সুযোগ পাবে, যা দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার পর একটি বড় সান্ত্বনা।
আঞ্চলিক কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই পদক্ষেপটি ইসরাইলের আন্তর্জাতিক চাপের প্রতিক্রিয়া হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বহু দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা গাজার মানবিক সংকট সমাধানে ইসরাইলকে সীমান্ত খুলতে আহ্বান জানিয়েছে। রাফা সীমান্তের পুনরায় খোলার মাধ্যমে ইসরাইল এই আহ্বানগুলোর একটি অংশ পূরণ করেছে, যদিও শর্তাবলী এখনও কঠোর রয়ে গেছে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “রাফা সীমান্তের পুনরায় চালু হওয়া গাজার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সিগন্যাল, তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে কতজনকে প্রকৃতপক্ষে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে এবং নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ওপর।” তিনি আরও যোগ করেন, “যদি ইসরাইল এবং মিশর সমন্বয় করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সহজ করে দেয়, তবে এই সীমান্ত গাজার পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় মূল ভূমিকা পালন করতে পারে।”
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবিক সংস্থা গাজার সীমান্তে প্রবেশের সংখ্যা, সরবরাহিত সাহায্যের পরিমাণ এবং নিরাপত্তা প্রোটোকলের কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। যদি সীমান্তের ব্যবহার বৃদ্ধি পায় এবং মানবিক সহায়তা সুষ্ঠুভাবে পৌঁছায়, তবে ইসরাইল ও মিশরের মধ্যে আরও সীমান্ত খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে, জাতিসংঘের মানবিক সমিতি গাজার সামগ্রিক পরিস্থিতি উন্নত করতে অতিরিক্ত সহায়তা ও তহবিল সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, রাবিবার থেকে রাফা সীমান্তের পুনরায় খোলার সিদ্ধান্ত গাজার বাসিন্দা, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক গতি-প্রকৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করে। শর্তসাপেক্ষ হলেও এই পদক্ষেপটি গাজার মানবিক সংকট লাঘবের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।



