জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ৩৬ ধাপের নির্বাচনী ইশতেহার উন্মোচন করেছে। এই ঘোষণাটি শুক্রবার বিকালে ঢাকার একটি হোটেলে ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ শিরোনামের অনুষ্ঠানে করা হয়। দলটি ইশতেহারকে বাস্তবসম্মত ও সংস্কারমুখী রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যা জনগণের দৈনন্দিন সংগ্রাম ও রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক সমস্যার সমাধানকে লক্ষ্য করে।
এনসিপি উল্লেখ করেছে যে এই ইশতেহার কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ধারণা নয়; এটি দলের রাষ্ট্রকল্প, নীতিগত অবস্থান এবং সংস্কারভিত্তিক রাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতার ফল। দলটি বলেছে, ইশতেহারের প্রতিটি অঙ্গীকার ন্যায়পরায়ণতা, বাস্তব পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাই ভোটারকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধোঁকা দেওয়া তাদের লক্ষ্য নয়।
দলটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে নির্বাচনে জয়লাভের জন্য তারা ভোটারকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধোঁকা দিতে চায় না। বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে বিবেচনা করে, আগামী পাঁচ বছরে সম্ভবপর পরিবর্তনের মাত্রা ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য দলটি ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়েছে।
ইশতেহারে উল্লেখিত প্রধান ক্ষেত্রগুলো হল অর্থনীতি, নারী উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা। এই চারটি বিষয়ের উপর আলোকপাতের পর, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ৮৬ পৃষ্ঠার বিশদ ইশতেহার উপস্থাপন করেন। তিনি স্বীকার করেন যে সব সেক্টরই এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে এগুলোকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইশতেহারটি চারটি উপস্থাপনা শেষে প্রকাশিত হয়, যা প্রতিটি ক্ষেত্রের মূল নীতি ও কর্মসূচি সংক্ষেপে তুলে ধরে।
নাহিদের মতে, ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য সরকারী অংশীদারিত্ব প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, “যদি আমরা সরকারে অংশগ্রহণ করি, তবে এই অগ্রাধিকারগুলোকে কার্যকর করার সুযোগ পাব।” এই বক্তব্যের পেছনে দলটির জোট গঠন প্রক্রিয়া রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন আদর্শের দলগুলো একসঙ্গে কাজ করবে। জোটে কোনো একক দলের আদর্শ সরকারকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করবে না, বরং সমন্বিতভাবে নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে সংস্কার, বিচার ও অন্যান্য নূন্যতম রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
দলটি জোর দিয়ে বলেছে, জোটে কোনো একক দলের আদর্শ সরকারকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করবে না। বরং সমন্বিতভাবে নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে সংস্কার, বিচার ও অন্যান্য নূন্যতম রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এই সমন্বিত পদ্ধতি তাদেরকে বিভিন্ন সেক্টরে সমানভাবে কাজ করার সুযোগ দেবে।
এনসিপি ইশতেহার প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে, দলটি ভোটারকে আশ্বাস দিয়েছে যে নির্বাচনের পর তারা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে ইশতেহারের ধারাগুলোকে বাস্তবায়ন করবে। ইশতেহারের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তদারকি কমিটি গঠন করা হবে।
ইশতেহারে উল্লেখিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, কর সংস্কার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) সমর্থন অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও যুব উদ্যোগকে উৎসাহিত করার ব্যবস্থা রয়েছে। নারী উন্নয়নের দিক থেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সমতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে, মৌলিক সেবা পৌঁছানোর ব্যবস্থা, হাসপাতাল অবকাঠামো উন্নয়ন, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতি এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ডের প্রয়োগের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে, মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে অবকাঠামো সম্প্রসারণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রসারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গ্রামীণ ও নগর শিক্ষার মধ্যে বৈষম্য কমানোর জন্য বিশেষ উদ্যোগ ঘোষণা করা হয়েছে।
দলটি উল্লেখ করেছে যে, ইশতেহারের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তদারকি কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত হবে, যা নীতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন করবে। পাশাপাশি জনসাধারণের অভিযোগ ও পরামর্শ গ্রহণের জন্য একটি গ্রিভ্যান্স রেড্রেস সিস্টেম চালু করা হবে।
এখনো পর্যন্ত অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে ইশতেহার সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে বিশ্লেষকরা ইশতেহারকে নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে দেখছেন, যা ভোটারকে স্পষ্ট নীতি দিক নির্দেশনা দেয়। তারা উল্লেখ করেন, এমন বিশদ ম্যানিফেস্টো ভোটারকে পার্টির বাস্তবিক পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা দেয় এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় পার্থক্য গড়ে তোলে।
এনসিপি এই ইশতেহারকে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে একটি রোডম্যাপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে এবং আগামী সপ্তাহে জোট গঠন ও নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণের জন্য অভ্যন্তরীণ আলোচনার সূচনা করবে। জোটের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হলে ইশতেহারে নির্ধারিত অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত কাঠামো গড়ে তোলা হবে।



