মার্কিন সরকার কিউবার তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা প্রকাশ করে, যা মেক্সিকো ও রাশিয়া সরকারসহ কয়েকটি দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এই পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার অধীনে জারি করা আদেশের অংশ, যদিও শুল্কের হার বা নির্দিষ্ট দেশ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
ট্রাম্পের আদেশের পেছনে কিউবা সরকারের রাশিয়া, ইরান, হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো ‘শত্রু পক্ষ’গুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার অভিযোগ রয়েছে, যা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আদেশের ফলে কিউবায় তেল সরবরাহের মূল উৎসগুলোকে আর্থিক ও বাণিজ্যিক চাপের মুখে আনা হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
কিউবার রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ও সরকার ট্রাম্পের ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানিয়ে, এই পদক্ষেপের ফলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি, পানি সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখ করেছে। হাভানা সরকার এটিকে “কিউবান জনগণের ওপর পরিকল্পিত গণহত্যা” হিসেবে বর্ণনা করে, মার্কিন সরকারকে দেশের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে শ্বাসরুদ্ধ করার চেষ্টা হিসেবে অভিযুক্ত করেছে।
কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ এই পদক্ষেপকে “নৃশংস আগ্রাসন” এবং “আন্তর্জাতিক দস্যিপনা” বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি যুক্তি দেন যে শুল্ক আরোপ কিউবার অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে ধ্বংস করে, যা দেশের জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা সৃষ্টি করবে।
ট্রাম্পের কিউবার প্রতি কঠোর অবস্থান ভেনেজুয়েলা সরকারের পতনের পর থেকে দৃঢ় হয়েছে। একসময় ভেনেজুয়েলা সরকার কিউবার প্রধান তেল সরবরাহকারী ছিল, তবে নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তেল ও অর্থের প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, “ভেনেজুয়েলা থেকে আর কোনো তেল বা অর্থ কিউবায় যাবে না, একদম শূন্য। কিউবা খুব শীঘ্রই ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।” এই বক্তব্য কিউবার তেল সরবরাহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসের সমাপ্তি নির্দেশ করে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলা থেকে সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর মেক্সিকো কিউবার প্রধান তেল সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে। তবে মার্কিন শুল্কের সম্ভাবনা নিয়ে মেক্সিকো এখন এই নীতি পুনর্বিবেচনা করছে। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, মেক্সিকোর রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেমেক্স সাময়িকভাবে কিউবায় তেল পাঠানো স্থগিত করেছে। তিনি এটিকে চাপের মুখে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং “সার্বভৌম সিদ্ধান্ত” বলে উল্লেখ করেছেন।
কিউবায় তেলের মজুদ দ্রুত হ্রাসের ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, খাদ্য সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যাঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে, যা শিল্প ও গৃহস্থালির ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলবে। কৃষি ক্ষেত্রেও জ্বালানি ও সেচের অভাবে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাবে, ফলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
এই পরিস্থিতি কিউবার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও অস্থির করতে পারে। তেল সরবরাহের ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক সংকটের ফলে জনমত গঠনে চাপ বাড়বে, যা সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে। একই সঙ্গে, মার্কিন সরকারের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মঞ্চে কিউবার সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে রাশিয়া সরকার ও ভেনেজুয়েলা সরকারের সঙ্গে বিদ্যমান সহযোগিতা পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে।
ভবিষ্যতে মার্কিন সরকার শুল্ক আরোপের সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী প্রকাশ করলে কিউবা ও তার তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে নতুন আলোচনার দরজা খুলে যেতে পারে। তবে শুল্কের বাস্তবায়ন না হলে কিউবার বিদ্যুৎ ও খাদ্য সংকট তীব্র হতে পারে, যা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



