সিরিয়ার উত্তর-পূর্বে কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে সশস্ত্র বাহিনী এবং সরকারী সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ তীব্রতর হয়েছে। সাম্প্রতিক দুই সপ্তাহে দমাস্কাসের সরকারী সৈন্যগুলো কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (SDF) কে তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ এলাকা থেকে তাড়া করেছে, যা তারা দশ বছর ধরে দা’ইশ পরাজয়ের পর থেকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।
কমান্ডার আজাদ, যিনি কুর্দি যোদ্ধা হিসেবে বহুবার যুদ্ধের গোঁড়া দেখেছেন, তার শারীরিক ক্ষত ও রাজনৈতিক হতাশা উভয়ই প্রকাশ করেছেন। তিনি ২০১৮ সালে তুর্কি যুদ্ধবিমান দ্বারা বোমা হামলায় পা আঘাত পেয়েছিলেন এবং আত্মঘাতী বোমাবোমার শ্লেষ্মা থেকে শার্পেনেলও পেয়েছেন। তার হাতের আর্মে গভীর কাট, পিঠ, পেট ও নিম্নদেহে দা’ইশের চারটি পৃথক আক্রমণে আঘাতের দাগ রয়েছে। আজাদ তার কাঁধে সবুজ ফ্রিঞ্জড স্কার্ফ এবং হ্যান্ডেল-বার দাড়ি নিয়ে গর্ব করেন, তবে তিনি মার্কিন সরকারের প্রতি গভীর বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।
২০১৪ সালে দা’ইশ সিরিয়া ও ইরাকের প্রায় এক তৃতীয়াংশ দখল করার পর, মার্কিন সরকার ও কুর্দি বাহিনী ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করে ত্রাসী গোষ্ঠীকে পরাজিত করেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সরকার কুর্দি অংশীদারিত্ব থেকে দূরে সরে গিয়ে দমাস্কাসের সরকারকে সমর্থন করছে, যা কুর্দি নেতাদের কাছে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে ধরা পড়েছে। আজাদ বলেন, ইতিহাস এই পদক্ষেপকে বিচার করবে এবং কুর্দি জনগণ শেষ শ্বাস পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।
দমাস্কাসের সরকার, যা পুরো সিরিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের লক্ষ্য নিয়েছে, বর্তমানে কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের উত্তর-পূর্ব অংশে তার আধিপত্য বাড়াতে চাচ্ছে। সরকারী সেনাবাহিনীর অগ্রগতি মূলত তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ জোনে কেন্দ্রীভূত, যেখানে SDF দশ বছর ধরে নিরাপত্তা বজায় রেখেছে। এই অঞ্চলগুলো থেকে SDF-কে তাড়া করা কুর্দি-সিরিয়ান সংঘাতের নতুন পর্যায়ের সূচনা নির্দেশ করে।
হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক ঘোষণায় সিরিয়ার অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাআকে সমর্থন জানানো হয়েছে। আল-শারাআ পূর্বে জিহাদি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ইরাকে মার্কিন সৈন্যের সঙ্গে লড়াইয়ের ইতিহাস রয়েছে। তার নেতৃত্বে আল-কায়েদা শাখা সিরিয়ায় গঠন করা হয়েছিল, যদিও এই গোষ্ঠী দা’ইশের সঙ্গে তীব্র বিরোধে জড়িয়ে ছিল। কুর্দি কমান্ডার আজাদ আল-শারাআকে দা’ইশের প্রতিষ্ঠাতা আবু বকর আল-বাগদাদির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, উভয়ের নীতি ও পদ্ধতি সমান এবং জোলানি শাসনকালে সিরিয়া অবিরত যুদ্ধক্ষেত্র রয়ে যাবে।
SDF-র যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষতি উল্লেখযোগ্য; দা’ইশের সঙ্গে লড়াইয়ে প্রায় ১১,০০০ যোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছেন। এই সংখ্যা কুর্দি বাহিনীর সামরিক সক্ষমতার উপর বড় প্রভাব ফেলেছে এবং সরকারী সেনাবাহিনীর অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করেছে। আজাদ উল্লেখ করেন, যদিও নৈতিক দিক থেকে মার্কিন সরকারের পদক্ষেপ অনুচিত, তবু কুর্দি বাহিনী তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে।
কুর্দি-সিরিয়ান সংঘাতের এই নতুন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তন এবং হোয়াইট হাউসের সিরিয়ার অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থন অঞ্চলীয় শক্তি ভারসাম্যকে প্রভাবিত করছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও তুর্কি সরকারের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থও এই সংঘাতে প্রভাব ফেলছে, যদিও বর্তমান প্রতিবেদনে তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ উল্লেখ করা হয়নি।
অঞ্চলীয় বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি সরকারী সেনাবাহিনী কুর্দি নিয়ন্ত্রিত তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রগুলো সম্পূর্ণভাবে দখল করে, তবে সিরিয়ার অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠবে। তাছাড়া কুর্দি বাহিনীর প্রত্যাহার স্থানীয় নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি করতে পারে, যা দা’ইশের অবশিষ্ট গোষ্ঠী বা নতুন উগ্র গোষ্ঠীর জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।
কুর্দি কমান্ডার আজাদের মতে, কুর্দি জনগণকে এখনো আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন, বিশেষ করে মার্কিন সরকারের থেকে প্রত্যাশিত ন্যায়সঙ্গত আচরণ। তিনি উল্লেখ করেন, কুর্দি বাহিনী তাদের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য এবং সিরিয়ার সমগ্র ভূখণ্ডে শান্তি বজায় রাখার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে।
সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। মার্কিন সরকার, রাশিয়া, তুর্কি ও ইরানের মতো প্রধান শক্তিগুলি সিরিয়ার ভবিষ্যৎ গঠন নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। তবে কুর্দি-সিরিয়ান সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই শক্তিগুলোর মধ্যেও সমঝোতার দরকার বাড়ছে, যাতে বৃহত্তর মানবিক সংকট ও শরণার্থী প্রবাহ রোধ করা যায়।
এই সংঘাতের পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে সরকারী সেনাবাহিনীর তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র দখল সম্পন্ন করা এবং কুর্দি বাহিনীর প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করা প্রত্যাশিত। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবিক সংস্থাগুলি শরণার্থীদের সুরক্ষা ও মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভবিষ্যতে কুর্দি ও সরকারী পক্ষের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা সম্ভব হবে কিনা তা এখনও অনিশ্চিত, তবে বর্তমান যুদ্ধের গতি এবং আন্তর্জাতিক চাপের ফলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।



