বাংলাদেশের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই)‑এর সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) এর ২০২৭ মেথডোলজি রিপোর্টের লিড অথর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এই সিদ্ধান্তটি শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়। লিড অথর হিসেবে তার দায়িত্ব হবে পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে গ্লোবাল ক্লাইমেট নীতি গঠনে মূল ভূমিকা পালন করা।
বাছাই প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ ড. কামরুজ্জামানকে ২০২৭ সালের আইপিসিসি মেথডোলজি রিপোর্টের প্রধান লেখক হিসেবে নির্ধারিত করা হয়েছে। রিপোর্টটি কার্বন ডাইঅক্সাইড রিমুভাল (সিডিআর) এবং কার্বন ক্যাপচার, ইউটিলাইজেশন অ্যান্ড স্টোরেজ (সিসিইউএস) প্রযুক্তিগুলি কীভাবে জাতীয় গ্রীনহাউস গ্যাস (GHG) হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা প্রদান করবে। এই নির্দেশনা দেশগুলোকে তাদের নির্গমন হ্রাস লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়তা করবে।
ড. কামরুজ্জামান বর্তমানে বিআরআরআই‑এর ফার্ম মেশিনারি ও পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগে কাজ করছেন। তার গবেষণার মূল ক্ষেত্রগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন, ক্লাইমেট‑স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং গ্রীনহাউস গ্যাস মডেলিং ও প্রশমন কৌশল অন্তর্ভুক্ত। তিনি এই অভিজ্ঞতাকে আইপিসিসি রিপোর্টে ব্যবহার করে উন্নত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও দেশীয় বাস্তবতা সংযুক্ত করার পরিকল্পনা করছেন।
বাংলাদেশের বিজ্ঞানী হিসেবে এই নির্বাচন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে দেশের গবেষকরা এখন গ্লোবাল ক্লাইমেট নীতি ও কার্বন হিসাব পদ্ধতির মূল আলোচনার কেন্দ্রে অংশ নিচ্ছেন। দেশের কৃষি ও পরিবেশ গবেষণা সম্প্রদায়ের জন্য এটি গর্বের বিষয় এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা প্রকল্পের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করবে।
নির্বাচনের পর ড. কামরুজ্জামান উল্লেখ করেন, “এই সম্মানটি শুধুমাত্র আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি ও জলবায়ু গবেষণা ক্ষেত্রের সমষ্টিগত প্রচেষ্টার ফল। আমাদের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোকে গ্লোবাল নির্দেশিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ পেয়ে আমরা গর্বিত।” তিনি আরও বলেন, এই কাজের মাধ্যমে দেশীয় কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধন সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের আইপিসিসি‑এ অবদান পূর্বে বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীর মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে রয়ে এসেছে। প্রফেসর সেলিমুল হক ও ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ পূর্বে লিড অথর ও কো‑অর্ডিনেটিং লিড অথর হিসেবে বিভিন্ন চক্রে অংশগ্রহণ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রফেসর এ কে এম সাইফুল ইসলাম আইপিসিসি‑এর ষষ্ঠ ও সপ্তম মূল্যায়ন চক্রে লিড অথর হিসেবে কাজ করছেন। এই ধারাবাহিকতা দেশের বৈজ্ঞানিক ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার শক্তি তুলে ধরে।
আইপিসিসি হল জাতিসংঘের একটি বৈজ্ঞানিক সংস্থা, যা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু নীতি নির্ধারণে সহায়তা করে। সংস্থার মেথডোলজি রিপোর্টগুলো গ্লোবাল গ্রীনহাউস গ্যাস ইনভেন্টরি, নির্গমন হ্রাস লক্ষ্য এবং ক্লাইমেট ফাইন্যান্সের জন্য মানদণ্ড স্থাপন করে। ড. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে প্রস্তুত হওয়া রিপোর্টটি এই মানদণ্ডকে আধুনিক প্রযুক্তি ও দেশীয় বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে।
এই নির্বাচন দেশের গবেষণা নীতি নির্ধারক ও কৃষি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করে। গ্রীনহাউস গ্যাস হ্রাসে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও নীতি সমন্বয়কে ত্বরান্বিত করতে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। ড. কামরুজ্জামানের কাজের ফলাফল কীভাবে দেশের ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্সে অবদান রাখবে, তা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বিজ্ঞানী সম্প্রদায়কে এই সাফল্যকে ভিত্তি করে আরও গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে উৎসাহিত করা উচিত। গ্লোবাল ক্লাইমেট আলোচনায় দেশের স্বরকে শক্তিশালী করতে কী ধরনের নীতি ও তহবিলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।



