বাংলাদেশে শেষ পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় মোট ১৬৫ জনের মৃত্যু এবং ৩,৬৫৭ জনের আঘাতের রেকর্ড রয়েছে। এই সংখ্যা ভোট ফলাফল ঘোষণার পর থেকে ফলাফল ঘোষণার সাত দিন পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনার ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর সংকলন করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ নির্বাচনেও নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্কতা প্রকাশিত হয়েছে।
পাঁচটি নির্বাচনের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রাণহানি ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে ঘটেছে, যা ‘বিনা ভোটের’ নামে পরিচিত। ঐ নির্বাচনে ১১৫ জন নিহত এবং ৮৫৪ জন আহত হয়েছে। অন্যদিকে, ২০০৮ সালের নবম নির্বাচনে সর্বনিম্ন মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড হয়েছে, মাত্র ১১ জনের মৃত্যু। মোট আঘাতের সংখ্যা ৩,৬৫৭, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের অস্থিরতা নির্দেশ করে।
২০১৪ সালের দশম নির্বাচন একতরফা প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ ঘটেছিল; অধিকাংশ আসনে একক প্রার্থী থাকায় ভোটের প্রয়োজনই ছিল না। ফলে ১৫৩টি আসনে ভোট না দিয়ে নির্বাচনী ফলাফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হয়। এই অনন্য পরিস্থিতি সহিংসতার তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়, যেখানে গুলিবিদ্ধ, দাঙ্গা এবং ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
২০০৮ সালের নবম নির্বাচন ২৯ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন জয় করে সরকার গঠন করে। যদিও তুলনামূলকভাবে কম মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড হয়েছে, তবু ৩,৬৫৭ জনেরও বেশি আঘাতের সংখ্যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নির্দেশ করে।
২০০১ সালের অষ্টম নির্বাচনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিএনপি ১৯৩টি আসন জয় করে সরকার গঠন করে। ঐ সময়ের সহিংসতার পরিসংখ্যান তুলনামূলকভাবে কম, তবে রাজনৈতিক উত্তেজনা উচ্চমাত্রায় ছিল।
২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনকে ‘রাতের ভোট’ বলা হয়, কারণ ভোটগ্রহণের সময়সূচি অস্বাভাবিকভাবে সংক্ষিপ্ত ছিল। ২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচনকে ‘ডামি নির্বাচন’ নামে সমালোচকরা উল্লেখ করেছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনী সহিংসতায় দুইজনের মৃত্যু এবং ৭৫০ জনের আঘাতের রেকর্ড রয়েছে, যা পূর্ববর্তী নির্বাচনের তুলনায় কম হলেও উদ্বেগের বিষয় রয়ে গেছে।
গত ডিসেম্বরে ফলাফল ঘোষণার পরদিনই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল; পরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তদুপরি, ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ফলাফল ঘোষণার পর ৩৬ দিনে কমপক্ষে ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী নিহত হয়েছেন। এই ঘটনা নির্বাচনী পর্বে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি প্রকাশ করে।
বিচারিক আদেশের অমান্যতা নিয়ে ২৭ জানুয়ারি ২০২৬-এ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরকে অবৈধ নির্দেশনা মেনে না চলার নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনা নিরাপত্তা সংস্থার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং আইনি কাঠামোর প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
বিপক্ষের দৃষ্টিতে, নির্বাচনী সহিংসতা শুধুমাত্র নিরাপত্তা নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকেও ক্ষুণ্ন করে। বিরোধী দলগুলো নির্বাচনকে ‘বিনা ভোটের’ বা ‘ডামি’ হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং নিরাপদ ভোটদান নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা, পর্যবেক্ষক উপস্থিতি এবং স্বাধীন তত্ত্বাবধায়কের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে দাবি করে।
আগামী ত্রয়োদশ নির্বাচনে নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্কতা এবং আইনশৃঙ্খলা সংস্থার কঠোর নির্দেশনা সত্ত্বেও, রাজনৈতিক দলগুলো পুনরাবৃত্তি সহিংসতার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি সমাধান না করা হয়, তবে ভোটগ্রহণের স্বচ্ছতা এবং ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা উভয়ই প্রভাবিত হতে পারে, যা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।



