বাগেরহাটে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক নেতার স্ত্রী ও শিশুসন্তানের দেহ প্যারোলে না রেখে সরাসরি কবরস্থানে পৌঁছাতে না পারার ঘটনা সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অকার্যকারিতার দিকে তীব্র দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মৃতদেহের গাড়ি শেষে আনা হলে জানা যায়, পরিবারকে প্যারোলে মুক্তির সুযোগ না দিয়ে সরাসরি দেহ নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করে যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন অনুযায়ী মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বা অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করতে সক্ষম, তবে বাস্তবে এই ক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে না। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ফলে কমিশনের তৎকালীন চেয়ারপার্সন ও সদস্যরা নভেম্বরেই পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে কোনো নতুন নিয়োগ বা পুনর্গঠন করা হয়নি, ফলে প্রায় দেড় বছর ধরে কমিশন কার্যহীন অবস্থায় রয়েছে।
একই সময়ে তথ্য কমিশনও কার্যত অচল। সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে তথ্য কমিশনের প্রধান ও অন্যান্য কমিশনারদের পদত্যাগের পর সরকার নতুন কমিটি গঠন করেনি। তথ্যের অধিকার সংক্রান্ত ৬০০টিরও বেশি অভিযোগ দাখিল হওয়া সত্ত্বেও কোনো শুনানি বা নিষ্পত্তি করা হয়নি। তথ্য মন্ত্রণালয় জানায়, তথ্য কমিশন গঠনের জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার কি এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার পুনর্গঠন থেকে বিরত থাকে কারণ তাদের কার্যক্রমে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও স্বচ্ছতার বিষয়গুলো প্রকাশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। ইফতেখারুজ্জামান, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক, উল্লেখ করেন, মানবাধিকার ও তথ্য অধিকার সংস্থার অচলাবস্থা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের ইচ্ছাকৃত উদাসীনতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আইন অনুসারে, কমিশনকে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত, মধ্যস্থতা, আইনি সহায়তা প্রদান, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা, কারাগার ও আটককেন্দ্র পরিদর্শন করে উন্নয়নের সুপারিশ করা ইত্যাদি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই দায়িত্বগুলো বাস্তবে কার্যকর করা হচ্ছে না।
অধিকাংশ মানবাধিকার সংগঠন দাবি করে, অচলাবস্থার ফলে দেশের মানবাধিকার রক্ষার কাঠামো দুর্বল হয়েছে এবং ভুক্তভোগীরা যথাযথ সহায়তা পায়নি। তারা আরও উল্লেখ করে, তথ্য কমিশনের অকার্যকারিতা তথ্যের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের দ্রুত সমাধানকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
অন্তর্বর্তী সরকার শেষ মুহূর্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপার্সন ও কমিশনারদের নিয়োগে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নেয়। তবে এই নিয়োগগুলো সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রে তথ্য কমিশনের গঠন নিয়ে কোনো পরিকল্পনা না থাকায়, তথ্য অধিকার সংক্রান্ত অভিযোগের সমাধান দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
এই অচলাবস্থা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। যদি সরকার এই সংস্থাগুলোকে পুনর্গঠন না করে, তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা গোপন হয়ে যাবে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ব্যাহত হবে। অন্যদিকে, সংস্থাগুলো পুনর্গঠন করলে অতীতের লঙ্ঘনগুলো প্রকাশ পেতে পারে, যা বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
অধিকাংশ বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকরী পুনর্গঠন এবং তথ্য কমিশনের দ্রুত গঠন দেশের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রেকর্ডের উন্নতিতে সহায়ক হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোও বাংলাদেশের মানবাধিকার ও তথ্য স্বচ্ছতার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে।
বাগেরহাটের ঘটনাটি এই অচলাবস্থার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। পরিবারকে প্যারোলে মুক্তি না দিয়ে সরাসরি দেহ নিয়ে গিয়ে দাফন করা, মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টিতে মৌলিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন। এই ঘটনার পর মানবাধিকার সংগঠনগুলো জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দ্রুত পুনর্গঠন দাবি করে।
অধিকাংশ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেন, সরকার যদি এই সংস্থাগুলোর কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত না করে, তবে ভবিষ্যতে অনুরূপ লঙ্ঘনগুলো গোপন থাকবে এবং জনমতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অন্যদিকে, সংস্থাগুলোর স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করা হলে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত ও শাস্তি কার্যকরভাবে করা সম্ভব হবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আইন অনুযায়ী, কমিশনকে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত, মধ্যস্থতা, আইনি সহায়তা, এবং কারাগার পরিদর্শনসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হয়। তথ্য কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে তথ্যের অধিকার সংক্রান্ত অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সরকারি তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। উভয় সংস্থার অচলাবস্থা এই দায়িত্বগুলোকে ব্যাহত করছে।
অবশেষে, সরকারকে উভয় সংস্থার পুনর্গঠন দ্রুততর করে, স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার সুযোগ প্রদান করতে হবে। এধরনের পদক্ষেপ না নিলে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও তথ্য স্বচ্ছতার সমস্যাগুলো দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকবে এবং দেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করবে।



