ঢাকায় উচ্চ আদালত বিভাগ (HCD) ১১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মুসলিম পরিবার আইন আদেশ, ১৯৬১ (MFLO) এর ধারা ৬ অনুসারে বহুবিবাহের বৈধতা নিয়ে রায় প্রদান করে, যা পুরুষের দ্বিতীয় বিবাহের অনুমোদন প্রক্রিয়াকে পুনরায় আলোচনার মুখে আনছে। রায়ে আদালত বিদ্যমান বিধানকে অপরিবর্তিত রেখে পুনরায় নিশ্চিত করেছে, তবে এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আইনটির মানবিক দিক ও নারীর অধিকার নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
MFLO, যা বাংলাদেশে মুসলিম ব্যক্তিগত বিষয় যেমন বিবাহ, তালাক ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে, তার ধারা ৬ অনুসারে বিবাহিত মুসলিম পুরুষকে দ্বিতীয় বিবাহের আগে একটি ত্রিসদস্যীয় মধ্যস্থতা পরিষদের অনুমতি নিতে হয়। এই অনুমতির জন্য আবেদনকারীকে লিখিত আবেদনপত্র ও নির্ধারিত ফি জমা দিতে হয়, যাতে পরিষদ বিষয়টি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আবেদন প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতা পরিষদকে বিষয়টি শোনার জন্য একবার সভা করতে হয় এবং তার পর সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে। যদি পুরুষটি এই অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিবাহ সম্পন্ন করে, তবে ধারা ৫ অনুসারে তাকে অবিলম্বে দৌর (মহিলার দেহে নির্ধারিত আর্থিক দান) প্রদান করতে হবে এবং অতিরিক্ত শাস্তি আরোপিত হয়। এই শর্তটি মূলত বহুবিবাহের প্রক্রিয়াকে কিছুটা কঠিন করে তুলতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তবে বর্তমান বিধান প্রথম স্ত্রীর সম্মতিকে অনুমোদনের পূর্বশর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে না। ধারা ৬(২) ও মুসলিম পরিবার আইন নিয়ম, ১৯৬১ এর রুল ১৪ অনুযায়ী আবেদনপত্রে স্ত্রীর সম্মতি উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক, তবে তা অনুমোদনের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয় না; পরিষদ কেবলমাত্র তা একটি পার্শ্বীয় তথ্য হিসেবে নোট করে। ফলে স্ত্রীর ইচ্ছা না থাকলেও পুরুষের আবেদন অনুমোদিত হতে পারে।
মধ্যস্থতা পরিষদটি অস্থায়ী স্বভাবের, ফলে এর সদস্যসংখ্যা ও গঠন স্থায়ী বিচারিক কাঠামোর তুলনায় সীমিত। অধিকাংশ সময়ে পরিষদের সদস্য হিসেবে প্রবীণ পুরুষ বা পরিবারের প্রধান ব্যক্তিরা অংশ নেন, যা সিদ্ধান্তের বৈধতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে। যদিও উভয় পক্ষের প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা আছে, তবে বাস্তবে পুরুষের দৃষ্টিকোণ বেশি প্রাধান্য পায় বলে ধারণা করা হয়।
এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং স্ত্রীর সম্মতির অনুপস্থিতি নিয়ে নারী অধিকার সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা প্রকাশ করেছে। তারা দাবি করেন যে বহুবিবাহের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নারীর স্বায়ত্তশাসন ও সম্মতি নিশ্চিত করা উচিত, যাতে আইনটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরও ন্যায়সঙ্গত হয়। এছাড়া, বর্তমান বিধানকে আধুনিক সমাজের পরিবর্তিত মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়ের পর থেকে সংসদীয় আলোচনায় বহুবিবাহ বিধানের পুনর্বিবেচনা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও আইনপ্রণেতা মতবিনিময় শুরু করেছে। কিছু আইনপ্রণেতা প্রস্তাব করেছেন যে মধ্যস্থতা পরিষদের স্থায়িত্ব ও স্বচ্ছতা বাড়াতে আইন সংশোধন করা উচিত, অন্যদিকে স্ত্রীর সম্মতিকে বাধ্যতামূলক শর্তে রূপান্তর করার জন্য সংশোধনী প্রস্তাবিত হয়েছে। এই প্রস্তাবগুলো এখনও আলোচনার পর্যায়ে থাকলেও, ভবিষ্যতে সংশোধনী আইন পাস হলে বর্তমান প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।
উচ্চ আদালতের রায়ের ফলে বহুবিবাহ সংক্রান্ত আইনগত কাঠামো পুনরায় মূল্যায়নের দরজা খুলে গেছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি এখন আইনটির মানবিক দিক, নারীর অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত নীতি প্রণয়নের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় কী ধরনের পরিবর্তন আসবে এবং তা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা সময়ের সাথে সাথে স্পষ্ট হবে।



