বিজেপি-র সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন বুধবার দুর্গাপুরে অনুষ্ঠিত দলের কর্মী সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপক বলে দাবি করেন। তিনি উল্লেখ করেন, কবিগুরু নতুন শিক্ষার পদ্ধতি প্রবর্তন করে পুরো দেশকে সমৃদ্ধ করেছেন, যার জন্য তাকে শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। এই বক্তব্যের পর তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্ন তোলা হয়, বিশেষ করে ঐতিহাসিক রেকর্ডের সঙ্গে এর বৈসাদৃশ্যের কারণে।
নবীনের মন্তব্যের সময় তিনি উপস্থিত কর্মীদের সামনে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষামূলক অবদানকে জোর দিয়ে বললেন, “যে দেশকে তিনি নতুন শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছেন, সেটি শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে অগ্রসর হয়েছে”। তিনি এই তথ্যের উৎস উল্লেখ না করে, সরাসরি শ্রোতাদের সামনে উপস্থাপন করেন। একই সভায় তিনি “জয় বাংলা”র পরিবর্তে “জয় বঙ্গাল” স্লোগানও ব্যবহার করেন, যা উপস্থিতদের মধ্যে অতিরিক্ত আলোচনার সৃষ্টি করে।
প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলির জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন, যা নোবেল শান্তি পুরস্কার নয়। নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রথমবার ১৯০১ সালে প্রদান করা হয় এবং তা আন্তর্জাতিক শান্তি ও সমঝোতার ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য দেওয়া হয়। তাই রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারকে শান্তি পুরস্কার হিসেবে উল্লেখ করা ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
নবীন এই দাবির পেছনে কোনো প্রামাণিক সূত্র উল্লেখ না করলেও, তার বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত স্লোগান ও অন্যান্য মন্তব্যগুলো রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তদুপরি, বিগত সময়ে বিজেপি নেতারা জনসভার বা কর্মী সভায় অনুরূপ অস্বাভাবিক তথ্য উপস্থাপন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গের পূর্বতন বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ গরুর দুধে সোনা আছে বলে দাবি করেন, যা বৈজ্ঞানিকভাবে অপ্রমাণিত।
এর পাশাপাশি, দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একবার গণেশের মাথায় হাতির মাথা যুক্ত করার কথা উল্লেখ করে, সেই সময়ের প্লাস্টিক সার্জারিকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। এসব মন্তব্যের ধারাবাহিকতা দেখায় যে, কিছু সময়ে দলীয় উচ্চপদস্থ নেতারা তথ্যের যথার্থতা যাচাই না করে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন।
বিজেপি-র এই মন্তব্যের পর তৃণমূল পার্টির নেতারা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ, বাঙালি ও মনীষীদের সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে না”। তৃণমূলের এই মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এমন ভুল তথ্যের প্রচার দলীয় বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তৃণমূলের মুখপাত্ররা আরও যোগ করেন, “বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঠিক জ্ঞান ছাড়া এমন মন্তব্য করা অনুচিত”।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, নবীনের এই মন্তব্যের ফলে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের মধ্যে বিশ্বাসের হ্রাস হতে পারে। বিশেষ করে বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে এই ধরনের ভুল তথ্যের প্রচার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তদুপরি, তৃণমূলের তীব্র প্রতিবাদ ও মিডিয়ার ব্যাপক কাভারেজের ফলে বিজেপি দলকে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশলে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, নীতিন নবীনের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপক বলে দাবি করা একটি ভুল তথ্যের উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। এই ঘটনা শুধুমাত্র একক মন্তব্যের সীমা ছাড়িয়ে, দলীয় তথ্য নীতি ও রাজনৈতিক যোগাযোগের স্বচ্ছতার প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করে জনমত গঠন করা, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি অপরিহার্য দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াবে।



