ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা শহরে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নীতি সংলাপ (সিপিডি)ের চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান সরকার কর্তৃক ৩৮টি জটিল সংস্কার প্রস্তাবের ওপর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রস্তাবগুলোর প্রকৃত বিষয়বস্তু সাধারণ নাগরিকদের কাছে অজানা, ফলে ভোটের ফলাফলকে ভিত্তি করে কোনো গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
সম্মেলনে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের প্রফেসর নাওমি হোসাইনও আলোচনার অংশ ছিলেন। সোবহান বলেন, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা একবারের ভোটে শেষ করা যায় না; প্রস্তাব তৈরি, সংসদে বিতর্ক, আইনগত অনুমোদন এবং পরবর্তীতে সরকারী বাস্তবায়ন—all steps are essential. তিনি যুক্তি দেন, বর্তমান ‘হ্যাঁ‑না’ ভোটের পদ্ধতি এই ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করে একটি কাল্পনিক দৃশ্য তৈরি করছে।
সোবহান উল্লেখ করেন, জুলাই মাসে জাতীয় বাজেটের অংশ হিসেবে ঘোষিত সংস্কারগুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কোনো তথ্য পায় না। তিনি বলেন, সরকার ৩৮টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারকে গণতন্ত্রের পুনর্গঠনের মূলধারায় রূপান্তরিত করার দাবি করে, তবে এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক জোটের স্পষ্ট বক্তব্য শোনা যায়নি। বিশেষ করে প্রধান দুই জোট—বিএনপি‑জামায়াত নেতৃত্ব জোট—এর কোনো সদস্যই এই সংস্কারগুলোকে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তুলে ধরেনি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১৮ মাসের জন্য দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে সক্ষম হয়নি। কারণ, সংস্কার প্রস্তাব শুধুমাত্র লিখিত নথি নয়; তা সংসদে আলোচনার মাধ্যমে আইনগত রূপ নিতে হয় এবং তারপর ক্ষমতায় থাকা সরকারকে তা কার্যকর করতে হয়। এই প্রক্রিয়ার অভাবে কোনো সংস্কার কার্যকর করা সম্ভব নয়, এটাই তার মূল অভিযোগ।
সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারাভিযানকে সোবহান সমালোচনা করেন, তিনি বলেন, প্রচার কার্যক্রমের মূল সমন্বয়কারী আলী রিয়াজ, ব্যাংক কর্মচারী এবং সীমিত সংখ্যক এনজিও কর্মী। এদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণের সুযোগ কমে যায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভোটের জন্য জনসচেতনতা গড়ে তোলার পরিবর্তে একটি সংকুচিত গোষ্ঠীর মাধ্যমে ভোটকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সোবহানের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি ‘মিথ্যা বয়ান’ তৈরি করেছে, যেখানে সংস্কারকে একধরনের দ্রুত সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যদিও বাস্তবে তা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার যদি সত্যিই সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, তবে নাগরিকদের কাছে প্রস্তাবের বিশদ বিষয়বস্তু প্রকাশ করা এবং সংসদে বিস্তৃত আলোচনার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
এই মন্তব্যের পর, উপস্থিত বিশ্লেষকরা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন। তারা অনুমান করেন, যদি ‘হ্যাঁ‑না’ ভোটের ফলাফল স্পষ্ট না হয়, তবে সরকারকে পুনরায় সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করতে হতে পারে, যা আবার রাজনৈতিক জোটগুলোর মধ্যে নতুন আলোচনার দরজা খুলে দেবে। অন্যদিকে, ভোটে ‘হ্যাঁ’ পেতে পারলে সরকার তার সংস্কার পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে, তবে তা জনমতকে বিভ্রান্ত করার ঝুঁকি বহন করবে।
সম্মেলনের শেষ অংশে সোবহান পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, সংস্কারকে একটি কাল্পনিক দৃশ্য হিসেবে উপস্থাপন করা এবং তা একক ভোটে সমাপ্ত করা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ক্ষুণ্ন করে। তিনি আহ্বান জানান, সকল রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে একসাথে কাজ করে সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করা এবং সংসদে যথাযথ বিতর্ক নিশ্চিত করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে বাস্তবায়নযোগ্য ও টেকসই নীতি গড়ে ওঠে।



