কক্সবাজারের মোহেশখালি উপজেলা, দালঘাটা ইউনিয়নে বড় পরিসরের উন্নয়ন প্রকল্পের গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লা চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সমুদ্রের গভীরস্থলে বন্দর নির্মাণের কাজ চলছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা এই দুই প্রকল্পকে অঞ্চলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে।
প্রকল্পের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দালঘাটার ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কাঠামো ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। বহু পরিবার তাদের প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী জমি সরকারকে বিক্রি করে চলে গেছে। কিছু পরিবারকে অল্প ক্ষতিপূরণে স্থানান্তরিত করা হয়, আর কিছু এখনও বাড়ি ছাড়ার হুমকির মুখে বসে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা নির্বাচনের সময় কোন প্রার্থীকে সমর্থন করবেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, অধিকাংশই জমি ত্যাগের প্রয়োজন স্বীকার করেছে। তবে তারা সম্পূর্ণভাবে তাদের জন্মভূমি ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। তাদের প্রধান দাবি হল সরকার যেন জমি অধিগ্রহণের পর পরিকল্পিত টাউনশিপ গড়ে তোলার মাধ্যমে পুনর্বাসন নিশ্চিত করে, যাতে প্রভাবিত পরিবারগুলো নতুন বাড়ি পেতে পারে।
দালঘাটার ওয়ার্ড নং ৩ এর সদস্য জোমির উদ্দিন জানান, সরকার জমি দখল করার ফলে অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় জনগণের মূল চাহিদা হল কর্মসংস্থান ও নিরাপদ বাসস্থান। তিনি সরকারকে যথাযথ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কক্সবাজার‑২ (মোহেশখালি ও কুতুবদিয়া) আসনটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন ক্ষেত্র। উপকূলীয় এই দ্বীপভিত্তিক এলাকা ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক ও শিল্পকেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, ফলে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এখানে প্রায়ই শক্তিশালী প্রার্থী দায়ের করে।
চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় মোহেশখালি ও কুতুবদিয়া অঞ্চলে প্রায় ৩.৮৮ লক্ষ ভোটার নিবন্ধিত। ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে স্থানীয় ভোটাররা উল্লেখ করেন, আসল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে উন্নয়ন প্রকল্পের সুবিধা ও ক্ষতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা, বিশেষ করে পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
দালঘাটার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা উন্নয়নের সুবিধা পেতে চায়, তবে তা তাদের জীবনের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ না করে। তারা আশা করেন, সরকার জমি অধিগ্রহণের পর পরিকল্পিত টাউনশিপ গড়ে তুলবে, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাণিজ্যিক সুবিধা থাকবে। এভাবে তারা নতুন পরিবেশে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।
স্থানীয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীও এই প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক লাভের কথা উল্লেখ করে, তবে তারা জোর দিয়ে বলছে যে শ্রমিক পরিবারগুলোর জন্য যথাযথ কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করা দরকার। এ ছাড়া প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়নি যে কীভাবে পুনর্বাসন ও টাউনশিপ গঠন করা হবে। তবে জোমির উদ্দিনের মতামত অনুযায়ী, সরকারকে দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা উচিত।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোও দালঘাটার জনগণের চাহিদা মেনে নীতি নির্ধারণে মনোযোগ দিচ্ছে। কিছু প্রার্থী ইতিমধ্যে টাউনশিপ পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থান গ্যারান্টি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে।
দালঘাটার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কীভাবে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো এই বৃহৎ প্রকল্পের সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমন্বয় করে নীতি গঠন করবে তার ওপর। যদি যথাযথ পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যায়, তবে এই অঞ্চলকে দেশের নতুন বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা আরও দৃঢ় হবে।
সারসংক্ষেপে, দালঘাটার বাসিন্দারা উন্নয়নের সঙ্গে তাদের জীবনের নিরাপত্তা, বাসস্থান ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার দাবি তুলে ধরছেন। আসন্ন নির্বাচনে এই বিষয়গুলোই হবে মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, যা শেষ পর্যন্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।



