বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে যে, গত এক বছর অর্ধে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) থেকে ফার্নেস অয়েল ক্রয় করতে মোট ৬৪৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়েছে।
গতকাল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বের্ক) এর সামনে অনুষ্ঠিত সর্বজনীন শুনানিতে পিডিবি কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, বিপিসি ফার্নেস অয়েলের জন্য লিটারে ৮৬ টাকা স্থির মূল্য ধার্য করেছে, যদিও প্রকৃত ক্রয়মূল্য মাসভেদে ৫৭ থেকে ৮৩ টাকার মধ্যে পরিবর্তিত হয়েছে।
বিপিসি সরবরাহের ৩৫ শতাংশ দেশীয় পূর্বশোধনাগার—ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে আসে, আর বাকি ৬৫ শতাংশ আমদানি করা হয়। পিডিবি দাবি করে, মূল্য নির্ধারণে দেশীয় ও আমদানি মূল্যের ওজনযুক্ত গড় ব্যবহার করা উচিত, স্থির বা একপাশের হিসাব নয়।
পিডিবি পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা বলেন, ফার্নেস অয়েল কাঁচা তেলের উপ-উৎপাদন এবং এর আন্তর্জাতিক ফ্রি অন বোর্ড (FoB) মূল্য নির্ধারিত থাকে। ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন খরচ এই আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে বেশি হওয়া উচিত নয়, তবু বিপিসি উচ্চমূল্য ধার্য করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিপিসি দীর্ঘদিন ধরে লিটারে ৮৬ টাকায় অয়েল বিক্রি করছে, যেখানে বেসরকারি সংস্থাগুলি গত ডিসেম্বর মাসে একই পণ্য লিটারে ৫৭ টাকায় আমদানি করেছিল।
বের্কের এই শুনানি ফার্নেস অয়েল মূল্যের প্রথম সর্বজনীন আলোচনা হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়। পিডিবি দেশের সরকারী তেল-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রধান গ্রাহক, যেখানে বিপিসি সরবরাহিত অয়েল সরাসরি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশে ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ৫,৬৩৪ মেগাওয়াট, যা মোট ক্ষমতার প্রায় ২০ শতাংশ গঠন করে। বিপিসি প্রতি বছর প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ টন ফার্নেস অয়েল বিক্রি করে।
এর মধ্যে প্রায় ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সরকারী বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে বিপিসি সরবরাহের উপর নির্ভরশীল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিট খরচ লিটারে ২৭.৩৯ টাকা, যেখানে গড় উৎপাদন খরচ ১২.৯৮ টাকা।
সেই একই সময়ে পিডিবি সরকারী অনুদান হিসেবে ৩৮,৬৩৭ কোটি টাকা পেয়েও ১৭,০২১ কোটি টাকার ক্ষতি বহন করেছে। বিপিসি এই সময়ে পিডিবি-কে অয়েল বিক্রি থেকে ৪,৩১৬ কোটি টাকার মুনাফা অর্জন করেছে।
এই পার্থক্য পিডিবির আর্থিক ভারকে বাড়িয়ে তুলেছে এবং বিদ্যুৎ সেবার টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা ও বাজারভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ না করলে সরকারী সাবসিডি ও শিল্পের ব্যয়বহুলতা বাড়তে পারে।
ভবিষ্যতে পিডিবি ও বিপিসি উভয়েরই মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন ও দেশীয় উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। এছাড়া, বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে রূপান্তর ও নিয়ন্ত্রক তদারকি শক্তিশালী করা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।



