প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় সংসদ ও ত্রয়োদশ গণভোটকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সহায়তা চেয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার এই নির্বাচনের জন্য কোনো প্রকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
গত বুধবার, ২১ জানুয়ারি, তিনটি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সরকারী প্রধান উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, “নির্বাচনের প্রস্তুতি ধাপে ধাপে শুরু হয়েছে, আজ থেকে কাজ শুরু, ১২ ফেব্রুয়ারি হবে চূড়ান্ত দিন।” তিনি এভাবে নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের ইঙ্গিত দেন।
একই সপ্তাহে, ২৬ জানুয়ারি, সেনাসদরে সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ড. ইউনুস পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, “এই সংবেদনশীল সময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি অতীতের মতোই এইবারও সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করেন।
সেনাবাহিনীর প্রধান, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, তদুপরি, নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমস্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, “সেনাবাহিনীর দায়িত্ব হল ভোটারদের নিরাপদে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ রোধ করা।” এই বক্তব্যে তিনি সরকারের আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
অন্তর্বর্তী সরকার পূর্বের তিনটি বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পুনরায় গণমানুষের আস্থা অর্জনের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে চায়। সেই লক্ষ্যেই এইবার প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসাথে অনুষ্ঠিত হবে, যা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে একটি নতুন মোড় তৈরি করতে পারে।
সশস্ত্র বাহিনীর তিনটি শাখা—সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী—একত্রে নির্বাচনের নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করেছে। তারা ভোটকেন্দ্র, ভোটার তালিকা ও ভোটগণনা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করবে বলে জানানো হয়েছে।
বৈঠকে উল্লেখ করা হয় যে, অর্থ, পেশিশক্তি ও কারসাজি যেন নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব না ফেলে, তা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর নজরদারি চালু করা হবে। নির্বাচনের আগে এবং পরে উভয় পর্যায়ে নিরাপত্তা দলগুলো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।
সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, তারা ভোটারদের গোপনীয়তা রক্ষা এবং ভোটের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দল গঠন করেছে। এই দলগুলো ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে উপস্থিত থাকবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দ্রুত হস্তক্ষেপের জন্য প্রস্তুত থাকবে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুসের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি আদর্শ উদাহরণ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তিনি উল্লেখ করেন, “একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য, এবং সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বই তা নিশ্চিত করতে পারে।”
সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, সরকার ভোটারদের ভোটের অধিকার পুনরুদ্ধারেও গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, “বছরের পর বছর ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষদের জন্য এই নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।” এভাবে ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই সমন্বিত প্রচেষ্টা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক হবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। যদিও এখনো কিছু রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে উদ্বেগের স্রোত রয়েছে, তবে সরকার ও সেনাবাহিনীর যৌথ প্রতিশ্রুতি নির্বাচনের স্বচ্ছতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ত্রয়োদশ গণভোটকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য বাংলাদেশ সরকার, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস এবং সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা একত্রে কাজ করছেন। এই সমন্বিত প্রচেষ্টা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে ভবিষ্যতে আরও স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে।



