বড় প্রকাশক সংস্থাগুলো ইন্টারনেট আর্কাইভের প্রবেশাধিকার বন্ধ করেছে, কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক স্ক্র্যাপারগুলো এই ডিজিটাল লাইব্রেরি থেকে তাদের প্রবন্ধ অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা দেখছে। ইন্টারনেট আর্কাইভের ওয়েবসাইট ও ওয়েবস্ন্যাপশট সেবা সাংবাদিকদের মুছে ফেলা টুইট বা একাডেমিক টেক্সট পুনরুদ্ধারে সহায়তা করলেও, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে নতুন সংঘর্ষ দেখা দিচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো মূলত এআই কোম্পানিগুলোকে অবৈধভাবে ডেটা সংগ্রহ থেকে রোধ করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
ইন্টারনেট আর্কাইভের ওয়েবসাইট, বিশেষ করে ওয়েবস্ন্যাপশট, বহু বছর আগে থেকেই গবেষক ও সাংবাদিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার হিসেবে কাজ করেছে। মুছে ফেলা সামাজিক মিডিয়া পোস্ট, পুরনো সংবাদপত্রের ডিজিটাল কপি এবং বিভিন্ন একাডেমিক উপকরণ এখানে সংরক্ষিত থাকে। এ ধরনের সম্পদে সহজে প্রবেশের সুবিধা এখন এআই সিস্টেমের প্রশিক্ষণ ডেটা হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে, যা প্রকাশকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
এআই সেবার প্রদানকারীরা সহজে ব্যবহারযোগ্য, গঠনমূলক ডেটাবেসের সন্ধান করে, এবং ইন্টারনেট আর্কাইভের এপিআই এই চাহিদা পূরণে উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। ফলে স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রামগুলো এই এপিআইয়ের মাধ্যমে বিশাল পরিমাণে টেক্সট ডাউনলোড করে মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করতে পারে। প্রকাশকরা এই সম্ভাবনাকে অননুমোদিত কপিরাইট লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং তাদের কন্টেন্টে ইন্টারনেট আর্কাইভের বটের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। প্রকাশনা সংস্থা উল্লেখ করেছে যে ওয়েবস্ন্যাপশটের মাধ্যমে তাদের নিবন্ধগুলো এআই কোম্পানিগুলোকে অনুমতি ছাড়া সরবরাহ করা হচ্ছে। তাই তারা স্বয়ংক্রিয় বটকে ব্লক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সাবস্ক্রিপশন-ভিত্তিক আর্থিক সংবাদদাতা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস এবং অনলাইন ফোরাম রেডিটও তাদের সামগ্রীকে ইন্টারনেট আর্কাইভের সূচিকরণ থেকে আংশিকভাবে বাদ দিয়েছে। উভয় সংস্থা একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে তাদের কন্টেন্ট এআই প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার হতে পারে। এই ধরনের সীমাবদ্ধতা তাদের ডিজিটাল সম্পদের অননুমোদিত ব্যবহার রোধের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
প্রকাশক ও এআই কোম্পানির মধ্যে আইনি লড়াইও বাড়ছে। সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং ওপেনএআই এবং মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে, যেখানে তারা কপিরাইটেড বিষয়বস্তু অননুমোদিতভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ তুলেছে। এই মামলা প্রকাশকদের কপিরাইট রক্ষা করার প্রচেষ্টার একটি উদাহরণ।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং নিউ ইয়র্ক পোস্টও পার্লেক্সিটি নামের এআই সার্চ সেবার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। উভয় প্রকাশনা দাবি করে যে পার্লেক্সিটি তাদের নিবন্ধগুলোকে প্রশিক্ষণ ডেটা হিসেবে ব্যবহার করেছে, যা অনুমোদন ছাড়া হয়েছে। এই মামলা এআই সেবার ডেটা সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
দ্য আটলান্টিক, দ্য গার্ডিয়ান এবং পলিটিকোসহ একাধিক প্রকাশনা কোহেয়ার নামের এআই কোম্পানির বিরুদ্ধে একত্রে মামলা দায়ের করেছে। তারা যুক্তি দেয় যে কোহেয়ার তাদের কন্টেন্টকে বড় ভাষা মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করেছে, যা কপিরাইট লঙ্ঘন। এই যৌথ মামলা প্রকাশকদের সমন্বিত প্রতিরোধের ইঙ্গিত দেয়।
নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং শিকাগো ট্রিবিউন পার্লেক্সিটির বিরুদ্ধে পৃথকভাবে মামলা করেছে। উভয় সংস্থা দাবি করে যে পার্লেক্সিটি তাদের নিবন্ধগুলোকে প্রশিক্ষণ ডেটা হিসেবে ব্যবহার করেছে, যা অনুমোদন ছাড়া হয়েছে। এই আইনি পদক্ষেপগুলো এআই সেবার ডেটা সংগ্রহের নৈতিকতা ও আইনগততা নিয়ে আলোচনার সূচনা করেছে।
কিছু মিডিয়া সংস্থা এআই প্রশিক্ষণের জন্য তাদের আর্কাইভের ব্যবহারকে আর্থিক চুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এই চুক্তিগুলোতে প্রকাশক সংস্থাগুলোকে অর্থপ্রদান করা হয়, তবে লেখকদের সরাসরি ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না। ফলে কপিরাইটের আর্থিক সুবিধা মূলত প্রকাশনা সংস্থার পক্ষে যায়।
এআই টুলের দ্রুত বিস্তার কপিরাইট ও পায়রেসি সংক্রান্ত সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রকাশকরা শুধু ডেটা চুরি নয়, বরং তাদের সৃষ্টিকর্মের স্বীকৃতি ও ন্যায্য পারিশ্রমিকের দাবিও তুলে ধরছে। এই বিষয়গুলো ভবিষ্যতে ডিজিটাল কন্টেন্টের ব্যবহারের নীতিমালা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইন্টারনেট আর্কাইভের প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ করার ফলে গবেষক ও সাংবাদিকদের জন্য ঐতিহাসিক তথ্যের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। তবে প্রকাশকরা কপিরাইট রক্ষা ও এআই প্রশিক্ষণের ন্যায্য শর্ত নির্ধারণের জন্য এই পদক্ষেপকে প্রয়োজনীয় বলে দাবি করছে। এই দ্বন্দ্বের সমাধান কিভাবে হবে, তা ডিজিটাল মিডিয়া ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ গঠনে প্রভাব ফেলবে।



