বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে যে, মানব জীবনের দৈর্ঘ্য নির্ধারণে জিনের ভূমিকা পূর্বের ধারণার চেয়ে বেশি হতে পারে। গবেষকরা যখন রোগ, দুর্ঘটনা ও অন্যান্য বাহ্যিক কারণগুলো বাদ দিয়ে বিশ্লেষণ করেন, তখন জিনগত পার্থক্যগুলো মোট জীবদ্দশার প্রায় অর্ধেক ব্যাখ্যা করে। এই ফলাফলটি বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে, জীবনকাল প্রধানত জীবনধারা ও পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল।
এই গবেষণার ফলাফল জানুয়ারি ২৯ তারিখে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি মূলত মানব বয়স বৃদ্ধির গাণিতিক মডেলিংয়ের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল, যেখানে স্বিডেন, ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষক দলটি লক্ষ্য করে যে, যখন বাহ্যিক মৃত্যুর কারণগুলো (যেমন পরিবেশগত ঝুঁকি, অপরাধ বা দুর্ঘটনা) বাদ দেওয়া হয়, তখন তাত্ত্বিকভাবে বয়স বৃদ্ধির জিনগত উত্তরাধিকারিত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ইসরায়েলের রেভোটে অবস্থিত ওয়েজম্যান ইনস্টিটিউটের বায়োফিজিকিস্ট বেন শেনহার। তিনি উল্লেখ করেন, যদি আমরা বুঝতে পারি কেন কিছু মানুষ ধূমপান ও মদ্যপান সত্ত্বেও ১১০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে, তবে ভবিষ্যতে তা চিকিৎসা বা হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ধীর করতে সহায়তা করতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে জিনের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা বয়স বাড়ার প্রক্রিয়ার মৌলিক বোঝাপড়া বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ।
পূর্বে মানব জনসংখ্যার উপর করা বেশিরভাগ গবেষণায় জীবদ্দশার জিনগত উত্তরাধিকারিত্ব প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হিসেবে অনুমান করা হয়েছে, কিছু গবেষণায় তা মাত্র ৬ শতাংশ পর্যন্ত কম দেখা গিয়েছে। এই নিম্ন অনুমানগুলোই দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণা তৈরি করেছে যে, জীবনকাল মূলত বাহ্যিক কারণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বয়স বাড়ার জেনেটিক্সের প্রতি আগ্রহ কমে গিয়েছিল এবং বয়স বৃদ্ধির গবেষণায় জিনের গুরুত্বকে উপেক্ষা করা হতো।
শেনহার ও তার সহকর্মীরা মূলত বয়স বৃদ্ধির বৈচিত্র্য কীভাবে গাণিতিকভাবে মডেল করা যায় তা নিয়ে কাজ করছিলেন। একদিন মডেলের কিছু ইনপুট পরিবর্তন করার সময় তারা লক্ষ্য করেন যে, যদি বাহ্যিক মৃত্যুর কারণগুলো বাদ দেয়া হয়, তবে তাত্ত্বিকভাবে জিনগত উত্তরাধিকারিত্বের হার দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এই পর্যবেক্ষণটি বাস্তবিক কিনা তা যাচাই করার জন্য তারা ডেটা বিশ্লেষণে গভীরভাবে প্রবেশ করেন।
ডেটা সংগ্রহের জন্য স্বিডেন, ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি মৃত্যুর রেকর্ড ব্যবহার করা হয়। এই দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী মৃত্যুর তথ্যের গুণগত মান উচ্চ এবং জনসংখ্যার বৈচিত্র্যও যথেষ্ট। গবেষকরা এই তথ্যগুলোকে গাণিতিক মডেলে যুক্ত করে দেখেন যে, যখন বাহ্যিক মৃত্যুর হার শূন্য ধরা হয়, তখন জিনগত পার্থক্যগুলো জীবদ্দশার অর্ধেক পর্যন্ত ব্যাখ্যা করতে সক্ষম।
এই ফলাফলটি নির্দেশ করে যে, মানব জীবনের দীর্ঘায়ুতে জিনের অবদান পূর্বের অনুমানের চেয়ে বেশি হতে পারে, বিশেষত যখন বাহ্যিক হুমকি কমে যায়। তবে গবেষকরা জোর দিয়ে বলেন যে, এই ফলাফলটি তাত্ত্বিক মডেলের উপর ভিত্তি করে এবং বাস্তব জীবনে বাহ্যিক কারণগুলো সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব নয়। তবুও, এই গবেষণা বয়স বৃদ্ধির জেনেটিক্সের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।
বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ফলাফল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, যদি জিনের ভূমিকা সত্যিই এই মাত্রায় থাকে, তবে ভবিষ্যতে জেনেটিক গবেষণা ও থেরাপি বয়স বৃদ্ধির রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, এখনও অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে, যেমন কোন জিনগুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে এবং কীভাবে পরিবেশগত কারণের সঙ্গে তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া কাজ করে।
শেনহার দলের গবেষণা বয়স বৃদ্ধির জেনেটিক্সে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বিশদ গবেষণার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। বিশেষ করে, দীর্ঘায়ু অর্জনকারী ব্যক্তিদের জিনগত প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের পথ খুঁজে বের করা সম্ভব হতে পারে।
এই গবেষণার ফলাফলকে ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা এখন জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ধীর করার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন। যদিও এখনো ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা থেরাপি প্রস্তাব করা হয়নি, তবু এই দিকের গবেষণা দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, যখন বাহ্যিক মৃত্যুর কারণগুলো বাদ দেওয়া হয়, তখন মানব জীবনের অর্ধেক পর্যন্ত জিনগত পার্থক্য দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে। এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বয়স বৃদ্ধির গবেষণায় জিনের গুরুত্বকে পুনরায় মূল্যায়ন করার আহ্বান জানায়।
আপনার মতামত কী? আপনি কি মনে করেন ভবিষ্যতে জেনেটিক্সের মাধ্যমে বয়স বৃদ্ধির গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে? আপনার চিন্তাভাবনা শেয়ার করুন।



