কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নে ২৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ছয়জন কৃষককে মুক্তিপণ প্রদান করে মুক্তি দেওয়া হয়। গত ২৭ জানুয়ারি একই ইউনিয়নের মিনাবাজার এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রের পশ্চিম পার্বত্য অঞ্চলে কৃষিকাজের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে অপহৃত হওয়া এই লোকজনকে পরিবার থেকে সাত লাখ টাকার বেশি মুক্তিপণ সংগ্রহের পর ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্তিপণ সংগ্রহের পর পরিবারগুলোকে জানানো হয় যে, অপহরণকারীরা তলাজুরি পাহাড়ি ছড়ায় তাদের ছেড়ে দেবে, যেখানে তারা নিজে পথ জানার কারণে হেঁটে বাড়ি পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
অপহরণ ঘটার সময় ছয়জন কৃষক গুলিবিদ্ধ হয়ে বন্দি হয়। তাদের মধ্যে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের মিনাবাজার এলাকার সুলতান ফকিরের ছেলে মো. জমির (৬২ বছর), এজাহার হোসেনের ছেলে মো. আলম (১৮ বছর), শামশুল আলমের ছেলে জাহেদ হোসন ওরফে মুন্না (৩০ বছর) এবং রবিউল আলমের ছেলে মো. শফিউল আলম (১৩ বছর) অন্তর্ভুক্ত। একই ইউনিয়নের কম্বোনিয়া পাড়ার আশ্রয়কেন্দ্রের মোজাহার মিয়া (৫০ বছর) ও তার ছেলে মোস্তাক (১২ বছর) ও অপহৃত হয়।
মুক্তিপণ হিসেবে মোট সাত লাখ টাকার বেশি সংগ্রহের পর, অপহরণকারীরা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হোয়াইক্যং ও বাহারছড়া সংলগ্ন তলাজুরি পাহাড়ি ছড়ায় তাদের ছেড়ে দেয়। মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা পাহাড়ি পথে নিজে হেঁটে বাড়ি ফিরে আসে। মুক্তিপণ সংগ্রহের পর পরিবারগুলোকে জানানো হয় যে, অপহরণকারীরা তাদের নিরাপদে ছেড়ে দেবে, ফলে ভুক্তভোগীরা নিজে পথ চিহ্নিত করে বাড়ি পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ জালাল মিডিয়াকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মুক্তিপণ আদায়ের পর অপহরণকারীরা পাহাড়ি তলাজুরি পানির ছড়ায় ভুক্তভোগীদের ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মুক্তি পাওয়া ভুক্তভোগীরা অপহরণকারীদের মধ্যে চারজনকে স্থানীয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; তিনজন বাহারছড়া এলাকার বাসিন্দা এবং একজন উপজাতি সম্প্রদায়ের সদস্য।
অপহরণ ঘটার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ ঘটনাস্থলে তদন্ত শুরু করে। হোয়াইক্যং ইউনিয়নের স্থানীয় পুলিশ স্টেশন বিষয়টি জানিয়ে, মুক্তিপণ সংগ্রহের পর অপহরণকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তদন্তকালে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অপহরণকারীরা পাহাড়ি অঞ্চলে গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে এবং পূর্বে একই এলাকায় একাধিক অপহরণ ঘটেছে।
পাহাড়ি এলাকায় একের পর এক অপহরণের ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যদিও মুক্তিপণ দিয়ে ভুক্তভোগীরা ফিরে এসেছে, তবু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় মানুষরা দাবি করছেন, অপহরণকারী গোষ্ঠীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার।
অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। বর্তমানে পুলিশ অপহরণকারীদের গোপন নেটওয়ার্ক ভাঙার জন্য তথ্য সংগ্রহ চালিয়ে যাচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করার জন্য অনুসন্ধান বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া, মুক্তিপণ আদায়ের প্রক্রিয়ায় জড়িত কোনো মধ্যস্থতাকারী বা আর্থিক লেনদেনের রেকর্ডও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও সমাজসেবকরা এই ঘটনার পর পুনরায় নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তারা দাবি করছেন, পাহাড়ি অঞ্চলে নিয়মিত গশত ও পেট্রোলিং চালু করা, গ্রামবাসীদের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য শেয়ার করা এবং জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। একই সঙ্গে, মুক্তিপণ প্রদানের মাধ্যমে অপহরণকারীদের উৎসাহিত না করার জন্য সরকারী নীতি ও আইনি কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অপরাধের শিকারের পরিবারগুলো এখনো মানসিক শোকের মধ্যে রয়েছে, যদিও তাদের প্রিয়জন নিরাপদে বাড়ি ফিরে এসেছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা পুনরায় না ঘটার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এই মামলায় তদন্তের অগ্রগতি ও সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরবর্তী তথ্য পাবার সঙ্গে সঙ্গে জানানো হবে।



