রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে ২৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভা শেষ হওয়ার পর ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম জামাতের সঙ্গে জোট গঠন প্রক্রিয়ায় নিজেকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, জামাতসহ আটটি দল নিয়ে গঠিত জোটের পরিকল্পনা ছিল, তবে শেষ মুহূর্তে জামাতের স্বতন্ত্র পদক্ষেপে জোটের নেতৃত্ব বদলে যায় এবং ইসলামি আন্দোলনকে কেবল একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
রেজাউল করিমের মতে, জোটের মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামের পক্ষে একটি বৃহৎ উত্থান ঘটানো, কিন্তু জামাতের স্বার্থপর আচরণে সেই আশা ধূসর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, “জামায়াতসহ ৮ দলীয় জোট গঠন করে আমরা এগুচ্ছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে আমাদের কিছু না বলে জামায়াত অন্যান্য দলকে যুক্ত করেছে। জোটের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নিয়েছে জামাত। সেই নেতৃত্বের মাধ্যমে জামায়াত আমাদের ব্যবহার করতে চেয়েছিল। আমাদের একটা বড় আশা-আকাঙ্খা ছিল, ইসলামের পক্ষে একটা বড় উত্থান হবে। সেই আশা অন্ধকারে পরিণত হয়েছে।”
এই মন্তব্যের পর তিনি জামাতের ইসলামী নীতি ও রাষ্ট্রিক স্বীকৃতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। রেজাউল করিমের মতে, জামাত ইসলামকে রাষ্ট্রের স্তরে নিয়ে যেতে চায় না, ফলে ইসলামি আন্দোলনকে বাধ্য হয়ে জোট থেকে সরে এসে নতুন প্রতীক উপস্থাপন করতে হয়েছে। তিনি যোগ করেন, “জামায়াত ইসলামকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিতে চায় না, তখনই বাধ্য হয়ে আমরা সেখান থেকে সরে এসে জাতির সামনে যে কথা দিয়েছিলাম, সেই কথামতো হাতপাখা প্রতীকে ইসলামের একটা বাক্স জাতির সামনে রেখেছি। আশা করি, ইসলামের পথে রাখা বাক্সই বিজয়ী হবে, ইনশাআল্লাহ। যারা মানবতার মুক্তি চায়, যারা ইসলাম কায়েম করতে চায়, বিশেষ করে আলেম ওলামা আমাদের সাথে আছে। তারা হাতপাখাকে বিজয়ী করতে মুখিয়ে আছে।”
নির্বাচন সংক্রান্ত তার উদ্বেগও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। রেজাউল করিম উল্লেখ করেন, নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি ও তার দল শঙ্কা ও হতাশা অনুভব করছে। তিনি বলেন, “আমরা নির্বাচন নিয়ে অনেকটা শঙ্কিত ও হতাশ। অন্তবর্তীকালীন সরকার বলেছিল এমন একটা নির্বাচন উপহার দেওয়া হবে, যে নির্বাচন মানুষ স্মরণ করবে। সেই কথাটা স্মরণ করা নিয়ে বলছি, আপনারা সেই পরিবেশ তৈরি করতে পারেননি। আমরা এখনই লক্ষ্য করছি, বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা চলছে, আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে এগোচ্ছে সবাই।”
এছাড়া তিনি রঙপুরে অনুষ্ঠিত জনসভায় নারী কর্মীদের প্রতি অবহেলার কথাও উল্লেখ করেন। রেজাউল করিমের মতে, ভোলায় নারী কর্মীদের ওপর যে আচরণ হচ্ছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং পরিবেশের উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে আরও দায়িত্ব তাদের ওপর পড়বে। তিনি বলেন, “ভোলায় আমাদের নারী কর্মীদের ওপর যে আচরণ করছে, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এখন পরিবেশ ঠিক না করলে, সামনের পরিবেশের জন্য দায় আপনাদের মাথায় নিতে হবে।”
জনসভায় ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারাও বক্তব্য রাখেন, যা রেজাউল করিমের মন্তব্যের সঙ্গে সমন্বয় রূপে দেখা যায়। তবে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে এই মন্তব্যের কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
রেজাউল করিমের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, জামাতের সঙ্গে জোটের ব্যর্থতা এবং নির্বাচনী পরিবেশের অবনতি ইসলামি আন্দোলনকে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে কৌশলগতভাবে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সহিংসতা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা ভোটারদের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ এখনো ইসলামিক নীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে কেন্দ্র করে তার রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে চায়। রেজাউল করিমের মতে, আলেম ওলামের সমর্থন তাদের এই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আশাবাদী যে, হাতপাখা প্রতীকে রাখা ইসলামী বাক্সই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে।
নির্বাচনের ফলাফল কীভাবে গঠিত হবে তা এখনও অনিশ্চিত, তবে রেজাউল করিমের মন্তব্যগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য চাপ বাড়াবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সারসংক্ষেপে, রেজাউল করিমের বক্তব্য জামাতের সঙ্গে জোটের ব্যর্থতা, নির্বাচনী পরিবেশের অবনতি এবং নারী কর্মীদের প্রতি অবহেলা নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা হিসেবে বিবেচিত হবে। তার এই মন্তব্যগুলো ইসলামি আন্দোলনকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে প্রভাবিত করবে এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন আলোচনার সূচনা করতে পারে।



