গুগল ডিপমাইন্ডের নতুন এআই টুল ‘প্রজেক্ট জিনি’ এখন যুক্তরাষ্ট্রের গুগল AI Ultra সাবস্ক্রাইবারদের জন্য ব্যবহারযোগ্য হয়েছে। এই টুলটি ব্যবহারকারীদের টেক্সট বা ছবির মাধ্যমে ইন্টারেক্টিভ গেম বিশ্ব তৈরি করার সুযোগ দেয়। টুলটি প্রথমবারের মতো পাবলিক টেস্টিং পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা গবেষণার প্রোটোটাইপ হিসেবে চালু করা হয়েছে।
প্রজেক্ট জিনি গুগলের সর্বশেষ বিশ্ব মডেল ‘জিনি ৩’ এবং ইমেজ জেনারেশন মডেল ‘ন্যানো বানানা প্রো’‑এর সঙ্গে গেমিনি মডেলকে একত্রিত করে কাজ করে। এই সমন্বিত সিস্টেমটি টেক্সট বা ছবি ইনপুট থেকে ত্রিমাত্রিক গেম পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম। গুগল AI Ultra সাবস্ক্রাইবাররা এখন এই পরীক্ষামূলক সংস্করণটি ব্যবহার করে নিজেরাই গেমের মানচিত্র, চরিত্র এবং পরিবেশ ডিজাইন করতে পারবে।
বিশ্ব মডেল হল এমন এআই সিস্টেম যা কোনো পরিবেশের অভ্যন্তরীণ উপস্থাপনা তৈরি করে এবং ভবিষ্যৎ ফলাফল পূর্বাভাস ও কর্ম পরিকল্পনা করতে পারে। ডিপমাইন্ডের মতে, এই ধরনের মডেল কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা (AGI) অর্জনের পথে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যদিও AGI এখনও দূরের লক্ষ্য, বিশ্ব মডেলগুলো গেম, সিমুলেশন এবং রোবট প্রশিক্ষণের মতো বাস্তব ব্যবহারিক ক্ষেত্রে প্রথমে প্রয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ডিপমাইন্ডের গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, প্রজেক্ট জিনি ব্যবহার করে গেম ডেভেলপার এবং গেম প্রেমিকরা দ্রুত প্রোটোটাইপ তৈরি করতে পারবে, ফলে গেম ডিজাইন প্রক্রিয়ায় সময় ও খরচ কমবে। একই সঙ্গে, রোবটিক্স ক্ষেত্রে সিমুলেটেড পরিবেশে এজেন্ট প্রশিক্ষণ সহজ হবে, যা বাস্তব জগতে রোবটের পারফরম্যান্স উন্নত করতে সহায়তা করবে।
প্রজেক্ট জিনির প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব মডেল ক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা তীব্রতর হয়েছে। গত বছর ফেই-ফেই লি নেতৃত্বাধীন ওয়ার্ল্ড ল্যাবস ‘মার্বেল’ নামে একটি বাণিজ্যিক পণ্য চালু করেছিল, যা একই ধরনের গেম বিশ্ব তৈরি করতে সক্ষম। ভিডিও জেনারেশন স্টার্টআপ রানওয়ে সম্প্রতি নিজস্ব বিশ্ব মডেল প্রকাশ করেছে, আর মেটা (মেটা) এর প্রাক্তন প্রধান বিজ্ঞানী ইয়ান লেকুনের AMI ল্যাবসও এই প্রযুক্তিতে ফোকাস করছে।
ডিপমাইন্ডের লক্ষ্য হল ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা থেকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করা, যাতে মডেলের উন্নয়ন দ্রুততর হয়। গবেষকরা জানান, ব্যবহারকারীর ফিডব্যাক নতুন ফিচার যোগ করা, ত্রুটি সংশোধন এবং মডেলের স্থিতিশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই ধরণের ওপেন-টেস্টিং পদ্ধতি এআই গবেষণার স্বচ্ছতা ও ব্যবহারিকতা বাড়াতে সহায়ক বলে তারা বিশ্বাস করে।
প্রজেক্ট জিনি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে, তাই ফলাফল সবসময় প্রত্যাশিত না-ও হতে পারে। কখনও কখনও টুলটি চমকপ্রদভাবে খেলোয়াড়যোগ্য গেম বিশ্ব তৈরি করে, আবার কখনও অপ্রাসঙ্গিক বা অযৌক্তিক দৃশ্য উপস্থাপন করে। গবেষকরা স্বীকার করেন যে, মডেলটি এখনও শিখন ও অপ্টিমাইজেশনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, এবং ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়া এই প্রক্রিয়ায় মূল চালিকাশক্তি হবে।
টুলটি ব্যবহার করার পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে সহজ। ব্যবহারকারী প্রথমে ‘বিশ্ব স্কেচ’ নামে একটি প্রাথমিক ধারণা তৈরি করে, যেখানে টেক্সট বর্ণনা বা রেফারেন্স ছবি আপলোড করা হয়। এরপর সিস্টেমটি ইনপুটের ভিত্তিতে পরিবেশের টেরেইন, বস্তু, চরিত্র এবং ইন্টারেক্টিভ উপাদান স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি করে। ফলস্বরূপ ব্যবহারকারী একটি সম্পূর্ণ গেম লেভেল বা সিমুলেশন দৃশ্য পায়, যা আরও কাস্টমাইজ করা যায়।
ডিপমাইন্ডের এই উদ্যোগ গেম ডেভেলপমেন্টের ভবিষ্যৎকে পুনর্গঠন করতে পারে। স্বয়ংক্রিয় বিশ্ব নির্মাণের মাধ্যমে ছোট দলও উচ্চমানের গেম তৈরি করতে পারবে, আর বড় স্টুডিওগুলো দ্রুত প্রোটোটাইপ তৈরি করে বাজারের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে, রোবটিক্স ও সিমুলেশন ক্ষেত্রে বাস্তবিক প্রশিক্ষণ পরিবেশের খরচ কমে, যা শিল্প ও গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করবে।
প্রজেক্ট জিনি এখন গুগল AI Ultra সাবস্ক্রাইবারদের জন্য সীমিত সময়ের জন্য উন্মুক্ত, এবং ডিপমাইন্ডের দল ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত ডেটা বিশ্লেষণ করে মডেলের পরবর্তী সংস্করণে উন্নতি আনবে। এই ধরণের ওপেন-ইনোভেশন কেবল এআই গবেষণার অগ্রগতি ত্বরান্বিত করবে না, বরং গেম ও রোবটিক্স শিল্পে নতুন সৃষ্টিশীলতা ও উৎপাদনশীলতা নিয়ে আসবে।
গেমিং, সিমুলেশন এবং রোবটিক্সের সংযোগস্থলে বিশ্ব মডেল প্রযুক্তি কীভাবে ভূমিকা রাখবে তা এখনো পুরোপুরি নির্ধারিত নয়, তবে ডিপমাইন্ডের প্রজেক্ট জিনি এই দিকের প্রথম উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ব্যবহারকারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বাস্তবিক ফিডব্যাকের মাধ্যমে মডেলটি ধারাবাহিকভাবে পরিমার্জিত হবে, যা শেষ পর্যন্ত আরও বুদ্ধিমান ও স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের বিকাশে সহায়তা করবে।



