বাংলাদেশের প্লাস্টিক ও ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং সেক্টরের রপ্তানি সম্ভাবনা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা আজ ঢাকা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটিতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে উপস্থাপিত হয়েছে। সরাসরি ও পরোক্ষ রপ্তানি থেকে বর্তমান বছরে ২.২ বিলিয়ন ডলার আয়কারী এই শিল্প, নীতি সমর্থন পেলে দশ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে শিল্প নেতারা জানান।
সেমিনারের শিরোনাম “Packaging Export Potentiality and Identification”, যা প্লাস্টিক প্রোডাক্টস বিজনেস প্রোমোশন কাউন্সিল (PPBPC) ও বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BPGMEA) যৌথভাবে আয়োজন করেছে। আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক, প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি ফেয়ারের অংশ হিসেবে এই ইভেন্টটি অনুষ্ঠিত হয়।
এই আলোচনার মূল বক্তা ছিলেন প্রিমিয়াফ্লেক্স প্লাস্টিকস লিমিটেড (ACI PLC)-এর ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মো. আনিসুর রহমান। তিনি উল্লেখ করেন, ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং এখন রেডিমেড গার্মেন্টস, খাবার, ফার্মাসিউটিক্যালস ও দ্রুতগতির ভোক্তা পণ্য (FMCG) শিল্পের জন্য অপরিহার্য ব্যাকবোনে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, দেশের প্যাকেজিং বাজারের মোট মূল্য প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকা, এবং বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ১,১৫,০০০ টন। এই পরিসরে একশের বেশি প্রতিষ্ঠান সক্রিয়, তবে বর্তমানে মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ প্যাকেজিং পণ্য সরাসরি রপ্তানি হয়।
শিল্পের শক্তি হিসেবে তিনি দক্ষ শ্রমশক্তি ও তুলনামূলকভাবে কম উৎপাদন খরচকে উল্লেখ করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বন্ডেড গুদাম সুবিধার অভাব, সীমিত রপ্তানি প্রণোদনা এবং যথাযথ সার্টিফিকেশন সেবার ঘাটতি শিল্পের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে।
পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে টেকসই প্যাকেজিংয়ের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি জাতীয় লেবেল “Produced and Packaged in Bangladesh” প্রবর্তনের পরামর্শ দেন, যা আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিং শক্তি বাড়াতে সহায়ক হবে।
সেমিনারে উপস্থিত অন্যান্য শিল্প প্রতিনিধিরা ও সংস্থার কর্মকর্তারা এই দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করে, রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য বিশেষ নীতি কাঠামো, আর্থিক সহায়তা ও মানসম্পন্ন সার্টিফিকেশন সিস্টেমের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
বর্তমান সময়ে ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং শিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খল রেডিমেড গার্মেন্টস, খাবার ও ফার্মা সেক্টরের রপ্তানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এই সেক্টরের উন্নয়ন সরাসরি দেশের মোট রপ্তানি আয় বাড়াতে পারে, বিশেষ করে যখন বিশ্ব বাজারে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ের চাহিদা বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন, যদি সরকার বন্ডেড গুদাম নির্মাণে বিনিয়োগ করে, রপ্তানি প্রণোদনা বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন সহজলভ্য করে, তবে দশ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
সংক্ষেপে, বাংলাদেশের প্যাকেজিং শিল্পের বর্তমান অবস্থা শক্তিশালী ভিত্তি ও সম্ভাবনা দ্বারা চিহ্নিত, তবে নীতি সমর্থন ও অবকাঠামো উন্নয়নের অভাবই প্রধান বাধা। যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে এই সেক্টরটি দেশের রপ্তানি পোর্টফোলিওতে নতুন উচ্চতা অর্জন করতে পারে।
রপ্তানি-চালিত শিল্পগুলোর সঙ্গে প্যাকেজিং সেক্টরের সমন্বয় কিভাবে কাজ করে তা বিশ্লেষণ করা হয়। রেডিমেড গার্মেন্টসের জন্য হালকা ও টেকসই প্যাকেজিং, খাবারের জন্য সিলযোগ্য ও নিরাপদ প্যাকেজিং, এবং ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যগুলোর জন্য অ্যান্টি-সিলিকন প্যাকেজিং—all essential for maintaining পণ্যের গুণমান ও আন্তর্জাতিক মান।
সরকার যদি রপ্তানি-উদ্যোগী প্যাকেজিং উৎপাদনকারীদের জন্য বিশেষ ট্যাক্স রেহাই, রপ্তানি বীমা ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করে, তবে শিল্পের রপ্তানি হার দ্রুত বাড়বে বলে আশা করা যায়। এছাড়া, আন্তর্জাতিক মানের ISO এবং HACCP সার্টিফিকেশন সহজলভ্য করা শিল্পের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা বাড়াবে।
পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে বায়োডিগ্রেডেবল ও রিসাইক্লেবল উপকরণের গবেষণা ও উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। এই ক্ষেত্রে সরকারী গবেষণা তহবিল ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ নতুন পণ্য উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে।
ঝুঁকি দিক থেকে, বিশ্ব বাজারে চীনের মতো বড় উৎপাদকদের সঙ্গে মূল্য প্রতিযোগিতা, এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত নিয়মের কঠোরতা শিল্পকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। তাই, উচ্চ মানের পণ্য ও ব্র্যান্ডিং কৌশল গড়ে তোলা অপরিহার্য।
উপসংহারে, নীতি সমর্থন, অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ও আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন একসাথে কাজ করলে, বাংলাদেশের প্যাকেজিং শিল্পের রপ্তানি সম্ভাবনা দশ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করতে পারে এবং দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্যকে শক্তিশালী করবে।



